টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

কুরবানী: তাৎপর্য ও বিধিবিধান

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৩
  • ৭২২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

কুরবানী: তাৎপর্য ও বিধিবিধান :::::এখন জিলহজ্জ মাস চলছে। এ মাসের প্রথম দশদিনকে ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। এর কারণ দুটি ১ ইসলামের ৫ রুকুনের ১টি গুরুত্বপূর্ণ রুকুন হচ্ছে হজ্জ। হজ্জ আদায়ের মাস হচ্ছে এই মাস। ২. মুসলিম জাতির একটি গৌরবজ্জোল ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই মাসের সাথে। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম আঃ কর্তৃক স্বীয় সন্তান হযরত ইসমাঈল আঃ কে কুরবান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এ মাসে। যারই ফলশ্র“তিতে হযরত ইব্রাহীম আঃ এর স্মৃতির কথা স্মরণ করেই ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহ প্রবর্তন করেন কুরবানের।

কোরবানের বিশ্লেষণঃ কোরবান এটি আরবি শব্দ। শাব্দিক অর্থ হল, নৈকট্য অর্জন করা। পরিভাষায় কুরবানী বলা হয়। নিজের প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানীঃ পবিত্র কুরআনে সুরা মায়েদার ২৭নং আয়াতে উল্লেখ আছে, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানী দিয়েছিল হযরত আদম (আঃ) এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিল। ইখলাসের কারণে হাবিলের কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবুল হয় এবং দাম্ভিকতার কারণে কাবিলের কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়।

নিজ সন্তানকে কুরবানীঃ  হযরত ইব্রাহীম আঃ এর বয়স যখন প্রায় ১০০ বছর তখন অনেক কান্নাকাটি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাকে হযরত ইসমাইল আঃ কে দান করেন। এই আদরের সন্তান যখন একটু একটু হাঁটতে লাগল, তখন তাকে আদেশ দেওয়া হল, হে ইব্রাহীম ইসমাইলকে আমার সন্তুষ্টির জন্য কুরবান দাও। ইব্রাহীমের উপর শুরু হয় কঠিন পরীা। কিন্তু তিনি যে আল্লাহর খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) আবার পুত্রও কোন অংশেই কম নয়। তাই তারা পরীায় উত্তীর্ণ হবেন না, একি হয়? পরিশেষে, শয়তানের সব কুমন্ত্রণাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তারা পৌঁছে গেলেন সফলতার সর্বোচ্চ চূড়ায়। সাত আসমান থেকে আল্লাহর ঘোষণা, তুমি সফল, উত্তীর্ণ। তুমি স্বপ্নকে পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছ। পরীায় তুমি ১০০ তে ১০০ পেয়েছ। তাঁর এই কুরবানী আল্লাহর দরবারে এত পছন্দনীয় হয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুসলমানের জন্য কুরবানীকে (যদি সামর্থ থাকে) ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে।

কোরবানীর ফজীলতঃ হাদীসে আছে, সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কুরবানী কী? তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, এই কুরবানী হল তোমাদের আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম আঃ এর আদর্শ, সুন্নাত। তারা আবার জিজ্ঞাসা করল, এতে আমাদের প্রতিদান কী হবে? রাসূল সাঃ বললেন, প্রতিটি কেশের পরিবর্তে তিনি তোমাদেরকে একটি করে সওয়াব দান করবেন। তারা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, আমরা যদি ভেড়া কুরবানী করি, ভেড়ার তো অনেক পশম, এর বদলেও কি আল্লাহ আমাদেরকে সওয়াব দান করবেন? রাসূল সাঃ বললেন, অবশ্যই দিবেন। (ইবনে মাজা-২/১০৪৫)

অন্য হাদীসে আছে, কিয়ামতের দিন মানুষ যখন পুলসিরাত পার হবে, তখন আল্লাহ সে সারা জীবন যত কুরবানী করেছিলো সব জন্তুকে একটি জন্তু বানিয়ে তার ফুলসিরাত পার হওয়ার বাহন বানিয়ে দেবেন। অন্য হাদীসে আছে, কুরবানের দিন কুরবানীর চেয়ে বড় অন্য কোন ইবাদত নেই। জন্তুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়।

কার উপর কুরবানী ওয়াজিবঃ ১০ যিলহজ্জের ফজর থেকে ১২ই যিলহজ্জের সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্থাৎ কুরবানীর দিনগুলোতে যরা নিকট ফিতরা ওয়াজিব হওয়া পরিমাণ (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার পরিমাণ টাকা) অর্থ-সম্পদ থাকে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। কিন্তু তাকে মুসলমান সুস্থ, প্রাপ্ত বয়স্ক ও মুকীম হতে হবে। করতে হবে ঈদের নামাজের পর।

কোন কোন জন্তু দিয়ে কুরবানী করতে পারবেঃ ছাগল, পাঠা খাসী, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা, গাভী, ষাড়, বলদ, মহিষ, উট এই কয় প্রকার গৃহপালিত জন্তু দ্বারা কুরবানী করতে পারবে। গরু ও মহিষের বয়স কমপে দুই বৎসর হতে হবে। উট এর বয়স কমপে পাঁচ বৎসর হতে হবে। আর বকরী, খাসী, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা কমপে পূর্ণ এক বৎসর বয়সের হতে হবে।

কুরবানীর জন্তুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা প্রসঙ্গঃ নিয়তকে অবশ্যই স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। আমার সামর্থ অনুযায়ী বাজার থেকে ভাল জন্তু ক্রয় করে আমি কুরবানী করব। ফিকাহর কালজয়ী গ্রন্থ কুদুরীতে উল্লেখ আছে, কোন অন্ধ গরু-ছাগল কুরবানী করা যাবে না। দুই চোখ নষ্ট হয়ে গেছে বা এক চোখ নষ্ট হয়ে গেছে এরকম কোন জন্তু কুরবানী করা যায় না। ঐ গরুকেও কুরবানী করা যাবে না যার চার পা থেকে যে কোন এক পা নষ্ট, পঙ্গু, হেঁটে যেতে পারে না এবং সে গরু ছাগল কুরবানী করা যাবে না, যার হাড্ডি শুকিয়ে গেছে। এত ীণকায় এত দুর্বল যে হাড্ডির মগজ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে, লেজহীন বা লেজের অধিকাংশ কাটা অথবা কান কাটা জন্তু দিয় কুরবানী করা জায়েজ হবে না। তবে হ্যাঁ, খাসি করা জন্তু দিয়ে কুরবানী করা যাবে। যে জন্তুর চামড়ায় সামান্য একটু দাগ লেগেছে, যে জন্তু পাগলের মত এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে বা মস্তিস্ক বিকৃত হয়ে গেছে এ জাতীয় গরু ছাগল দিয়ে কুরবানী হয়ে যাবে।

একটা পশুতে কয়জন শরীক হতে পারে? বকরী, খাসী, পাঠা, ভেড়া, ভেড়ী ও দুম্বায় একজনের বেশী শরীক হয়ে কুরবানী করা যায় না। এগুলো একটা একজনের নামেই কুরবানী হতে পারে। গরু মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক হতে পারে। তবে সাতজন হওয়া জরুরী নয়। এরচেয়ে কমও হতে পারে। তবে কারও অংশ যেন সাতভাগের একভাগের চেয়ে কম না হয়। প্রত্যেক অংশীদারের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হতে হবে। অন্য কোন উদ্দেশ্য কুরবানী করলে কারো কুরবানী বিশুদ্ধ হবে না।

পশু জবাই করা প্রসঙ্গেঃ নিজের কুরবানী নিজে জবাই করা মুস্তাহাব। ইসলাম কোন পাদ্রীবাদের ধর্ম নয়। ইমাম, মোয়াজ্জিনকে ডেকে আনতে হবে, এমন কোন কথা নেই। কিন্তু আলেমদের হাদিয়া অবশ্যই দিবেন। কারণ, তাদের সম্মান অনেক উপরে। জবাই করা এমন কোন কঠিন বিষয় নয় যে, আমি পারব না। গলার নালি, দুটো বড় রগ এবং খাদ্যনালী, এই চারটি জিনিস কাটা গেলে জবাই হয়ে যাবে। তিনটাও যদি কাটা যায়, তবেও জবাই হয়ে যাবে। ছুরিকে ভালভাবে ধারিয়ে নিতে হবে। ‘বিসমিল্লাহ আল্লাহ আকবর’ বলে কুরবানী করতে হবে। লম্বা দোয়াগুলো মুখস্ত করতে পারলে অবশ্যই উত্তম। না পারলেও সমস্যা নেই।

গোশত বন্টনের নিয়মঃ সবাই যদি একই পরিবারের হয় তবে বন্টনের প্রয়োজন নেই। অন্যথায় বন্টন করতে হবে। অংশীদারগণ গোশত অনুমান করে বন্টন করবে না বরং দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করে বন্টন করবে। অন্যথায় ভাগে সমস্যা হলে গোনাহগার হবে।

কুরবানীর গোশতের বিধানঃ কুরবানীর গোশত নিজে খাওয়া, পরিবারবর্গকে খাওয়ানো, আত্মীয়-স্বজনকে দেয়া এবং গরীব মিসকিনকে দেয়া সবই জায়েজ। উত্তম হল, গোশতকে তিনভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের জন্য, একভাগ আত্মীয়-স্বজনকে এবং একভাগ গরীবদেরকে দান করা। কুরবানীর গোশত শুকিয়ে বা ফ্রীজে রেখে দীর্ঘদিন খাওয়াতে কোন অসুবিধা নেই।

কুরবানীর চামড়ার বিধানঃ কুরবানীর পশুর চামড়া শুকিয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে নিজেও ব্যবহার করা জায়েজ। কুরবানীর চামড়া দানও করা যায়, বিশেষ করে মাদরাসার ছদকা ফান্ডে দান করলে ইলমের প্রচার প্রসারে সহযোগিতার সওয়াবও পাওয়া যায়। চামড়া বিক্রি করাও জায়েজ। তবে ঐ টাকা নিজে ব্যবহার করতে পারবে না। বরং দানই করে দিতে হবে এবং ঐ টাকাটাই দান করতে হবে।

ঈদুল আযহার দিনের আমলঃ ১। ঈদের দিন খুব ভোরে উঠা, ২। মসজিদের নামাজ আদায় করে ঈদের প্রস্তুতি নিতে হবে। ৩। গোসল করা, ৪। মেসওয়াক করা, ৫। নতুন জামা বা পরিস্কার জামা পরিধান করা, ৬। সুগন্ধি-আতর ব্যবহার করা, ৭। তাকবীরে তাশরীক পড়ে পড়ে ঈদগাহে যাওয়া, ৮। এক রাস্তায় যাওয়া, আরেক রাস্তায় আসা, ৯। ঈদগাহের দিকে আসার সময় জোরে তাকবীর বলা, ১০। ঈদের জামাত খোলা ময়দানে পড়া।

তাকবীরে তাশরীকের বিধানঃ ৯ই জিলহজ্জের ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ্জের আসর নামাজ পর্যন্ত সর্বমোট ২৩ ওয়াক্তে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। জামায়াতে নামাজ হোক বা একাকী, পুরুষ হোক বা নারী। তাকবীরে তাশরীক এইঃ ‘আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ’। এই তাকবীর জোর আওয়াজে বলা ওয়াজিব। তবে মহিলারা নিম্ন স্বরে বলবে। সালাম ফিরানোর সাথে সাথে এই তাকবীর বলতে হবে। ইমাম সাহেব বলতে ভুলে গেলে মুক্তাদীগণ সাথে সাথে বলবে, যাতে ইমামের স্মরণ হয়ে যায়। তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব। তিনবার বলা সুন্নাত কিংবা মুস্তাহাব নয়। ঈদুল আযহার নামাজের পরও এই তাকবীর বলা উচিত।

আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পদ্ধতিতে কুরবানী সম্পাদন করার মাধ্যমে হযরত ইব্রাহীম আঃ এর সুন্নাত জিন্দা করার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

হাফেজ রিদওয়ানুল কাদির ফাযেল, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম। সেক্রেটারী পালং ইসলামী ছাত্র সংস্থা, বৃহত্তর পালং কক্সবাজার। মোবাইলঃ ০১৮১২৭৬৬৮৯৩ ই-মেইল: যধৎরফধিহ১৯৯১@মসধরষ.পড়স

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT