টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

কী হচ্ছে মিয়ানমারে

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৭ আগস্ট, ২০১২
  • ৩২২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

আসিফ রশীদ….অজ্ঞাত কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের কাছ থেকে একটি ই-মেইল এসেছে আমার মেইলবক্সে। শুনেছি অনেকের কাছেই এ মেইল এসেছে। মেইলটিতে বেশ কিছু ছবি পাঠানো হয়েছে। মিয়ানমারে সংঘটিত সাম্প্রতিক গণহত্যার ছবি। দেশটির রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ চালানোর কথা আমরা শুনেছি। এ উৎপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে দলে দলে রোহিঙ্গারা নৌকা করে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেছে, হয়তো এখনও করছে। অনেকে এসে নানা স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেককে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নামতে দেয়া হয়নি, ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বাহাস হয়েছে। এ প্রসঙ্গ পরে।
মিয়ানমারে দমনপীড়নের যে ঘটনা ঘটেছে, হয়তো এখনও ঘটছে, তা কতটা ভয়াবহ, জানা ছিল না। আসলে ছবিগুলো না দেখলে কেউ ধারণা করতে পারবে না কী নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয়ে গেছে আমাদের প্রতিবেশী দেশটিতে। এসব হত্যার ঘটনাকে আমাদের জানা সাধারণ কোন এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত বিশোধন বলা যাবে না। মিয়ানমারের গণহত্যা আমাদের রুয়ান্ডা ও কম্বোডিয়ার গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। এ ঘটনার সঙ্গে তুলনা চলতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী দ্বারা সংঘটিত গণহত্যারও। কেননা মিয়ানমারের এ গণহত্যা শুধুই জাতিগত সংঘাতের জের ধরে সংঘটিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। এর পেছনে সাম্প্রদায়িক উসকানি রয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তথা সামরিক জান্তা সরাসরি জড়িত এ ঘটনায়। প্রতিটি ছবি সে প্রমাণ বহন করছে। ধারণা করা যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এ কাজে জড়িত। অন্তত একটি ছবি দেখে তেমনটিই মনে হয়।
আমার মেইলে যে ছবিগুলো এসেছে, এমন নৃশংস দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আমি শুধু বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছি। ছবি ১ : বেশকিছু মানুষকে খালি গায়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে ওপর করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করছে বন্দুক হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। সম্ভবত ধৃত লোকগুলোকে হত্যা করার আগমুহূর্তের দৃশ্য এটি। ছবি ২ : একটি ট্রাক ভরা মৃতদেহ। পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর তিন সদস্য। ট্রাকের পাশে খালি গায়ে পিঠমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে বসা কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। ছবি ৩ : একটি নদী বা সমুদ্রতীরে খালি গায়ে অগণিত মানুষের লাশ। অদূরে অস্ত্র হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ক’জন সদস্য। ছবি ৪ : দীর্ঘ দুই সারি মাচার মতো কোন কিছুর ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ। তাদের পরনে প্রায় কিছুই নেই। হঠাৎ দেখে মৃত পশুর স্তূপ মনে হয়। তাদের চারপাশে গেরুয়া পোশাকের অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু। ছবি ৫ : একটি ঘরের ভেতর সারিবদ্ধভাবে চারটি মৃতদেহ। গুলিতে একজন বৃদ্ধের মাথার খুলি বেরিয়ে এসেছে। ছবি ৬ : একটি গ্রামের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ছে। ছবি ৭ : লাশের জঞ্জালের ওপর একটি শিশুর মৃতদেহ ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। ছবি ৮ : একটি খোলা জায়গায় পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া অগণিত শিশুর লাশ। এর মাঝ দিয়ে তিনজন স্বাস্থ্যকর্মীকে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। অদূরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়ে। ছবি ৯ : একটি তাঁবুর ভেতরে সারিবদ্ধভাবে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের লাশ। তাদের আশপাশে কয়েকজনকে (সম্ভবত স্বাস্থ্যকর্মী) দেখা যাচ্ছে। ছবি ১০ : একটি জলযানের ওপর কয়েকজনের মৃতদেহ পড়ে আছে। ছবি ১১ : ভয়াবহ একটি ছবি! সদ্যোজাত কয়েকটি শিশুকে একটি টিনের ওপর রেখে আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। ছবি ১২ : বীভৎস দৃশ্য! পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া অগণিত শিশুর মৃতদেহ।
এ ধরনের অনেক ছবি এখন অনলাইনে গুগলে সার্চ দিয়েও পাওয়া যায়। মিয়ানমারে সাম্প্রতিক গণহত্যার ভয়াবহতা অনুধাবনের জন্য এ ছবিগুলোই যথেষ্ট। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এ মৃত্যু দাঙ্গার মৃত্যু নয়Ñ স্রেফ পশুর মতো মারা হয়েছে এসব মানুষকে। এর একটিই কারণÑ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা মুসলমানদের সেদেশের নাগরিক মনে করে না। বিস্ময়ের ব্যাপার, এমন নৃশংস গণহত্যার ব্যাপারে বিশ্ববিবেক প্রায় সম্পূর্ণ নীরব! পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা নিজেদের বিশ্ব মানবাধিকার সুরক্ষার প্রহরী বলে মনে করে, তারা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে এ ঘটনা। আরব লীগ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকাও প্রায় অভিন্ন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ যেসব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাকে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিনিয়ত সমালোচনামুখর দেখা যায়, তারাও টু শব্দটি করছে না মিয়ানমারের ভয়াবহ গণহত্যার বিষয়ে। এতে বিশ্বের উগ্রপন্থী ইসলামী সংগঠনগুলো নানা প্রচারণা চালিয়ে ঘটনাটি নিজ স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। বস্তুত মিয়ানমারের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো এ গণহত্যায় বিশ্ব বিবেকের নীরবতা জঙ্গিবাদকে আরও একবার উসকে দেবে।
প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী নেত্রী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির ভূমিকাও। তিনি জাতিগত বিশোধনমূলক নীতি অবলম্বনের জন্য প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের প্রতি নিন্দা প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বরং গত জুনে যুক্তরাজ্য সফরকালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সভায় সু চি যে বক্তৃতা দিয়েছেন তাতে অনেকটা থেইন সেইনের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সু চি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারের স্থায়ী অধিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, নাগরিক হিসেবে নয়। এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, মুসলিম নিধনের ব্যাপারে সু চির নিষ্ক্রিয়তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ২০১৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ও ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় আছে। এ অবস্থায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি সমর্থন প্রকাশের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না সু চি। তবে তার এ ভূমিকা তার বিশাল ব্যক্তিত্ব, তার নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ব্যঙ্গ করছে।
মিয়ানমারে গণহত্যার মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার যে অবস্থান নিয়েছে, তা অযৌক্তিক নয়। আগের রোহিঙ্গা সমস্যারই যেখানে সমাধান হয়নি, সেখানে নতুন করে শরণার্থী সমস্যা দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি কতদিনে হবে তা অনিশ্চিত। বিশেষ করে যখন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট বলছেন, রোহিঙ্গাদের তারা স্বাগত জানাবেন না। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার এ দেশে দীর্ঘ সময়ের জন্য শরণার্থী আশ্রয় দেয়া আসলেই বোঝাস্বরূপ। এ ব্যাপারে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে শুধু নয়, আইন-শৃংখলার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমন তথ্যও রয়েছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশী পরিচয়ে বিদেশে চাকরি নিয়ে গিয়ে অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের ঘটনা বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষতিকর। কোন দেশ জেনেশুনে বারবার একই ঝুঁকি নিতে পারে না।
তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের ঘটনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজের উদ্বেগ তুলে ধরতে পারে। নৃশংসতার জন্য মিয়ানমার সরকারের নিন্দা জানাতে পারে। এর দরকারও আছে। কারণ এ ঘটনায় যে ক’টি দেশে সরাসরি প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। কারও ঘরে আগুন লাগলে প্রতিবেশীর ঘরের নিরাপত্তাও বিঘিœত হওয়ার আশংকা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, যে ভয়াবহ নৃশংস ঘটনা সেখানে ঘটে গেছে, তাতে আমাদের বিবেক নিশ্চুপ থাকতে পারে না। থাকা উচিত নয়।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক
ধংরভ.ৎধংযববফ@ুধযড়ড়.পড়স

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT