টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

করোনাভাইরাস: কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে ‘৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২০
  • ৪৯১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস এর মহামারির কারণে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব মিলিয়ে গত ৩ মাসে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স এর সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন: করোনা মহামারীর কারণে কক্সবাজারে পর্যটন সংশ্লিষ্ট, ক্ষুদ্র ,মাঝারি, বড় সব মিলে গত তিন মাসে ৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এবারের বাজেটেও এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনার আওতায় আনা, ব্যাংক ঋণ মওকুফ সহ নানা প্রস্তাবনা সহকারে এফবিসিসিআইকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

করোনায় স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজার। লাখো দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পদভারে যে সৈকত মুখরিত থাকত সে সমুদ্র সৈকতটি এখন শুন্য বালুচরে পরিণত। কক্সবাজারের সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস। তিন শতাধিক রেস্টুরেন্ট, সহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সে সাথে চলছে রেড জোন ঘোষণা করে লকডাউন। শুধুমাত্র হোটেল-মোটেল আর রেস্টুরেন্টেই গত তিন মাসে ক্ষতি হয়েছে ১ শ’২৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকার।

এর মাঝে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা পায়নি কোন প্রণোদনা। সদ্য ঘোষিত বাজেটে নেই কোন বরাদ্দ। বেকার হয়ে পড়েছে এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সহ প্রায় ১ লাখ কর্মচারী। অনেকেই পেশা বদল এর চেষ্টা করছে। তারা পাইনি কোনো প্রকার সাহায্য সহযোগিতা। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও হোটেল রেস্টুরেন্ট স্বাভাবিক ও যন্ত্রপাতি ঠিকিয়ে রাখতে স্বল্প সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীদেও পাশপাশি বিদ্যুৎ চালু রাখতে হচ্ছে। এতে দিনদিন লোকসানের পরিমাণ বাড়লেও করোনা ভাইরাসের কারণে কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।

বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে মার্চের শুরু থেকে বন্ধ রয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা। এরপর সরকারি ঘোষণায় কক্সবাজারের সাড়ে শতাধিক হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস, রেস্টুরেন্ট, বিপণিবিতান, সৈকত সংলগ্ন শপিং মল, সৈকতের কিটকট, ট্যুর অপারেটরদের কার্যক্রম, বিচ বাইক সহ পর্যটনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমেই সারাদেশের মত সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কক্সবাজারে করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর, আবার রেড জোন ঘোষণা করে চলে লকডাউন।

প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে লকডাউন চালু করে ১৫ দিনের জন্য। তারপরও আক্রান্তদের সংখ্যা না কমায়, ২১ জুন থেকে আবারও ১০ দিনের জন্য রেডজোন দিয়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। করোনা ভাইরাস, রেডজোন, লকডাউন এর কারণে চরম দুচিন্তায় পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। হতাশার মধ্যে রয়েছে এ শিল্পের সাথে জড়িত কর্মকর্তা সহ ১ লাখ কর্মচারী। অনেকেই পেশা বদল করার চিন্তা করছে। বাসা ভাড়া দিতে না পেরে অনেকে ফিরে গেছে গ্রামে।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ট্যুয়াক এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন: গত ৩মাস ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ তিন শতাধিক ট্যুর অপারেটর ঘরেবন্দি রয়েছে। তাদের অফিস বন্ধ রয়েছে। কিন্তু অফিস ভাড়া আর বিদ্যুৎ বিল চলছে। এতে করে অনেক অপারেটর চরম অর্থ সংকটের মধ্যে রয়েছে এই মুহূর্তে।

তার মতে, অফিস ভাড়া বিদ্যুৎ বিল বাসা ভাড়া সহ প্রতিমাসে ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে ট্যুর অপারেটরদের। তারা এখন পর্যন্ত সরকারী কোন প্রকার সহযোগীতা পায়নি বলে ও জানান।

কক্সবাজার বীচ কিটকট মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন: মালিক -কর্মচারী সহ ১ হাজার মানুষ তিন মাস ধরে বেকার। তাদের কোনো প্রকার আয় রোজগার নেই। ইতিমধ্যে অনেকেই অর্থসংকটে পড়েছেন। ফলে আমরা সবাই অসহায় হয়ে পড়েছি। পায়নি কোন প্রকাল সহযোগীতা।

সমুদ্র সৈকতের লাবনী পয়েন্ট ছাতা মার্কেট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি কাসেম আলী বলেন: তিন মাস ধরে সব প্রকার ব্যবসা বন্ধ। চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। সামনের দিনগুলোতে কি করবো ভেবে পাচ্ছি না।

হোটেল বয় রফিকুল ইসলাম বলেন: তিন মাস ধরে চাকরি নেই, পরিবার নিয়ে চরম কষ্টের মধ্যে রয়েছি

হোটেল শ্রমিক মোঃ আব্দুল করিম বলেন: হোটেলে চাকরি করে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতাম। বাসা ভাড়া দিতে না পেরে একমাস আগে গ্রামে চলে আসছি। এখন অন্য কাজ বা অন্য পেশায় যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই।

সৈকতের ঝিনুক বিক্রেতা আবুল কাশেম বলেন: কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের মাঝে ঝিনুকের মালা, ঝিনুক এর তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে সংসার চালাতাম। তিন মাস ধরে সবকিছু বন্ধ। এনজিও থেকে কিস্তি নিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছি। সামনে কিভাবে কী করবো বুঝতে পারছি না।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস অফিসার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন: কক্সবাজারের সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউসগুলোতে কর্মকর্তা সহ ১ লাখ শ্রমিক রয়েছে। সবাই প্রশিক্ষিত এ পর্যটন শিল্পের জন্য। কিন্তু গত তিন মাস ধরে এক লাখ শ্রমিক বেকার রয়েছে। তারা কোন প্রকার সাহায্য পায়নি। অনেকেই বাসা ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে গেছে। এরা সবাই যদি পেশা বদল করে। পরবর্তীতে এই শিল্পে নতুন শ্রমিক তৈরি করতে অনেক বেগ পেতে হবে। তাই এসব শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে কিছু একটা করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি নাঈমুল হক চৌধুরী টুটুল বলেন: তিন মাস ধরে রেস্টুরেন্টের কর্মচারীরা চরম অর্থ সংকটের মধ্যে রয়েছে। জেলা প্রশাসককে আইডি কার্ড সহ সাড়ে ৩ হাজার শ্রমিকের তালিকা দেওয়ার পরও তাদের জন্য কিছু দেওয়া হয়নি। এসব শ্রমিকরা এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন যাপন করছে। রেষ্টুরেন্টগুলো বন্ধ থাকলেও দোকানের ভাড়া চলছে। ফলে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতি হচ্ছে। সে হিসেবে গত তিন মাসে ৩ শ রেস্টুরেন্টের ক্ষতি ৯ কোটি টাকা।

রফিক বাবুর্চি বলেন: তিন মাস ধরে রেস্টুরেন্টে চাকরি নেই। ঋণগ্রস্থ হয়ে গেছি। সামনের দিনগুলো শুধু অন্ধকার দেখছি।

ফেডারেশন অফ কক্সবাজার ট্যুরিজম সার্ভিস বাংলাদেশ এর মহাসচিব ও কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন: গত তিন মাস ধরে সবকিছু বন্ধ। এখন আমরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। আমাদের সংগঠনের ২৬০টি হোটেলে প্রতি মাসে ৩ লাখ টাকা করে ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি মাসে আমাদের ক্ষতি ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আমরা এখন পর্যন্ত কোন প্রকার প্রণোদনা পাইনি। আমরা একটি লিখিত আবেদন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার পৌরসভা, সংসদ সদস্য এর সুপারিশ সহ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি লিখিত আবেদন পাঠিয়েছি।

কক্সবাজার হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন: আমাদের সংগঠনে ১৭৫টি হোটেল রয়েছে। আমাদের হোটেলগুলোতে প্রতিমাসে ১ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

কক্সবাজার হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও হোটেল দ্য কক্স টুডের এমডি আব্দুল কৈইয়ুম চৌধুরী বলেন: তিন মাস ধরে সবকিছু বন্ধ। আমাদের সংগঠনের আওতায় ১৬টি ফাইভ স্টার মানের হোটেল রয়েছে। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও, হোটেলের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও হোটেল সচল রাখতে আমাদের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রেখে দিতে হয়েছে। সেই সাথে রয়েছে বিদ্যুৎ বিল ব্যাংক ঋণ। আমাদের এক একটি হোটেলে প্রতিমাসে ক্ষতি ২ কোটি টাকা। সে হিসেবে ১৫টি হোটেলে প্রতিমাসে ক্ষতি ৩০ কোটি টাকার। তার মতে গত তিন মাসে তাদের ক্ষতি ৯০ কোটি টাকার মতো। কক্সবাজারের মাধ্যমে বিশ্ব পর্যটন শিল্পের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এখানে অনেক বিদেশি পর্যটক আসতেন। এত কষ্ট করে গড়ে তোলা পর্যটন শিল্পকে ধরে রাখতে হবে যেকোনোভাবে। আশা করি এ ব্যাপারে সরকার আমাদের সহযোগিতা করবে।

হোটেল দ্য ওশান প্যারাডাইস এর চেয়ারম্যান লায়ন এম এন করিম বলেন: কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আজ চরম হতাশায় ভুগছি। করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের অন্যান্য সেক্টরের মতো আমাদের হোটেল ও বন্ধ। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও প্রতিমাসে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে দুই কোটি টাকার মত। পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের পাশাপাশি পর্যটন উদ্যোক্তাদেরও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে বলে মত দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করলেও। ব্যাংক গুলো এ ব্যাপারে আমাদের কোন প্রকার সহযোগিতা করছে না। কখন হোটেল চালু হবে জানি না। কোটি কোটি টাকার ইনভেস্ট করে চরম হতাশার মধ্যে রয়েছি।

তিনি এ ব্যাপারে প্রণোদনা সহ সরকারের সহযোগীতা কামনা করেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন: তিন মাস ধরে, হোটেল মোটেল বন্ধ, পর্যটন শিল্পের অবস্থাসহ সব বিষয় সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জানানো হয়েছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT