হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

ধর্ম ও দর্শনপ্রচ্ছদফিচার

কওমি মাদ্রাসা কি আইনের ঊর্ধ্বে?

আমাদের সময়.কম ::::মইনুল ইসলাম : সম্প্রতি টে61e244f7b10b769092486bcf30acb5c7-Mota-7-400x336লিভিশনে অর্থমন্ত্রীর একটি স্বীকারোক্তি আমাকে এই কলামটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেছেন, ‘আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর কারিকুলাম এখন যথেষ্ট উন্নত হলেও কওমি মাদ্রাসার অর্থায়ন যেহেতু সরকার করে না, তাই ওগুলোর কারিকুলামের ব্যাপারে কিছু করা যাচ্ছে না।’

অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তিতে বর্ণিত সরকারের এই অপারগতা একটি দুঃখজনক বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দেশের সংবিধানের ১৭(ক) ধারায় রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছে অঙ্গীকার করছে যে ‘রাষ্ট্র সকল শিশুর জন্য একটি একক মানসম্পন্ন, গণমুখী, সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত চালু করার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার পাশাপাশি দেশের সব প্রাথমিক স্কুলকে জাতীয়করণ করেছিল। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের যে প্রতিবেদনটি সরকার গ্রহণ করেছিল তাতে ওই বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক ও একক মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। ওই রিপোর্টের সুপারিশগুলো ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬-এর ২১ বছরে কোনো সরকারেরই সুবিবেচনা পায়নি, যদিও জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের সরকার নিজেদের পছন্দমাফিক একাধিক শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠন করেছে এবং শিক্ষা নিয়ে এন্তার ‘তুঘলকি এক্সপেরিমেন্ট’ চালিয়েছে। এমনকি শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকার কর্তৃক গঠিত ‘শামসুল হক কমিটির’ রিপোর্টেও এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর মহাজোট সরকার কর্তৃক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারটিকে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এবং বর্তমানে তা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। কিন্তু বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার যুগোপযোগী সংস্কারের বিষয়ে বর্তমান সরকারকে খানিকটা দ্বিধান্বিত মনে হচ্ছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় যে সমস্যাটা গৌণ ছিল, তা গত ৪০ বছরে একটা সংকটে পরিণত হয়েছে এবং তা ‘স্বাধীন কওমি মাদ্রাসার’ নাটকীয় বিস্তারের কারণেই।

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্তটি ছিল হিন্দুদের জন্য টোল এবং মুসলিমদের জন্য মাদ্রাসা। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে যে মাদ্রাসাশিক্ষার ধারা প্রচলিত হয়েছিল, সেটাই নানাবিধ পরিবর্তন-পরিবর্ধন-সংস্কারের মাধ্যমে এ দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে অনুসৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওহাবি আন্দোলনের ঢেউ ভারতে পৌঁছানোর পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিহারের দেওবন্দ মাদ্রাসা একদিকে ইসলামের মৌলবাদী চিন্তাচেতনার প্রসারে নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়, অন্যদিকে ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামেও ওহাবি ও ফারায়েজী আন্দোলনের একটা গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়। এই ব্রিটিশবিরোধী অবস্থানের কারণেই দেওবন্দ ঘরানার মাদ্রাসাগুলোতে বাগদাদের আব্বাসীয় শাসনামলের ‘নিজাজিয়া কারিকুলাম’ অব্যাহত রাখা হয়েছিল, যা এখনকার কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সামান্য সংস্কার করে চালু রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কওমি মাদ্রাসাগুলোর পরিচয় ‘ওহাবি মাদ্রাসা’ হিসেবে।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ মাদ্রাসাশিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করায় গত ৪০ বছরে এ দেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল সম্পদের দান হিসেবে মাদ্রাসাগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদেশি খয়রাত প্রবাহিত হতে শুরু করেছে সত্তর দশকের শেষার্ধ থেকেই, এবং গত ৪০ বছরে এর বড় অংশটাই কওমি মাদ্রাসাগুলো আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে। দেশের মধ্যেও অত্যন্ত সংগঠিত পদ্ধতিতে এসব মাদ্রাসা সারা বছর এবং প্রধানত ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে দান-খয়রাত সংগ্রহের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে থাকে। ফলে এই চার দশকে এ দেশের কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধিকে নাটকীয় বলা চলে। এই মাদ্রাসাগুলোতে যেহেতু একই সঙ্গে আবাসিক সুবিধা এবং আহারের ব্যবস্থা থাকে, তাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য এগুলোর আকর্ষণ ক্রমবর্ধমান। কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রকৃত সংখ্যা কত এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাই কত তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে রয়েছে কি না আমার সন্দেহ আছে—৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ছাত্রছাত্রী এই ধারার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষার সমপর্যায়ে সরকারের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে কওমি মাদ্রাসা চলছে কীভাবে? এ দেশে ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা চালু রয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রী আফসোস করেছেন। এই ১১ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাটা দেখুন: ১. সরকারি প্রাইমারি স্কুল, ২. এক্সপেরিমেন্টাল প্রাইমারি স্কুল, ৩. রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, ৪. নন-রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, ৫. প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট-সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল, ৬. কমিউনিটি স্কুল, ৭. স্যাটেলাইট স্কুল, ৮. হাইস্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল, ৯. এনজিও পরিচালিত স্কুল, ১০. কিন্ডারগার্টেন ও ১১. ইবতেদায়ি মাদ্রাসা।

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিশুকে এত ধরনের বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার জালে আটকে ফেলার এহেন নৈরাজ্যকর বন্দোবস্তের নজির বিশ্বের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পিতা-মাতার বিত্তের নিক্তিতে ওজন করে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে কে কিন্ডারগার্টেনে যাবে, কে সরকারি বা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে সুযোগ পাবে, কার এনজিও স্কুলে ঠাঁই হবে, আর কাকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে বাবা-মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যে ‘লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে’ ভাতটা তো অন্তত জুটল! এভাবে সারা জীবনের জন্য ওই শিশুকে বৈষম্যের অসহায় শিকারে পরিণত করে ফেললাম আমরা, যা তার মানবাধিকারের চরম লক্সঘন।

এর অপর পিঠে দেশে ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা বৃদ্ধিকেও নাটকীয় বলা চলে। মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পিতা-মাতারা তাঁদের সন্তানদের জন্য এখন আর বাংলা মাধ্যম প্রাইমারি স্কুলগুলোকে উপযুক্ত মানসম্পন্ন মনে করছেন না, কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোটাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে গত চার দশকে। মাধ্যমিক শিক্ষায় চারটি ধারার সমান্তরাল অবস্থান এখন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে—ইংরেজি মাধ্যমের নানান কিসিমের মহার্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মূল ধারার বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুল, বাংলা মাধ্যম বেসরকারি স্কুল এবং কয়েক ধরনের মাদ্রাসা। এই বিভাজিত ও বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা এক দেশের মধ্যে চার চারটি পৃথক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে চলেছি। এ ব্যাপারে আমাদের শাসক মহলের কোনো অপরাধবোধের বালাই নেই, অথচ এটা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য আত্মঘাতী হতে বাধ্য।

এ পর্যায়ে সাধারণ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দাবিদার নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা একক মানসম্পন্ন ও বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে সাংবিধানিক বিধিব্যবস্থা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে বসবাস করার সময় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ওই সব দেশে নগরের কোন এলাকার ছেলেমেয়ে কোন স্কুলে পড়বে তা নির্দিষ্ট করা থাকে, পিতা-মাতার ইচ্ছা কিংবা আর্থিক সংগতির ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করে না। যুক্তরাষ্ট্রে এই এলাকাগুলোকে ‘প্রিসিংকট’ বলা হয়। পিতা-মাতা যতই ধনাঢ্য হোক না কেন তাঁদের সন্তানেরা কোন প্রিসিংকটের কোন স্কুলে পড়বে সেটা নগরের স্কুল কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করে দেয়, বাবা-মাকে এ ব্যাপারে নিজেদের ইচ্ছা খাটানোর কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে সন্তানের মানবাধিকারের রক্ষাকর্তা পিতা-মাতা নয়, রাষ্ট্রই এই ভূমিকা পালন করে।

কোনো সভ্য দেশেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে পিতা-মাতাকে অগ্রাধিকার বা একক অধিকার দেওয়া হয় না। কারণ, পুত্রকন্যা পিতা-মাতার সম্পত্তি নয়। শিশুরা কী ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করবে, সেটা পিতা-মাতার ইচ্ছানুসারে হবে না। এমনকি শিশুর নিজেও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি নেই। যে মৌলিক দর্শন এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য তা হলো বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে কোনো শিশু যদি তার শৈশবকালে যুগোপযোগিতাহীন বা তার অপছন্দের কোনো শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য হয় তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ভুল শোধরানোর সুযোগ সে পাবে না। এ বিবেচনা থেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার তাগিদে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে একক মানসম্পন্ন করার জন্য জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের ‘মানবাধিকার ঘোষণায়’ অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকোর সব সদস্য এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম যুগোপযোগী করার জন্য চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শফীর নেতৃত্বে বেফাক নামের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু গত পাঁচ বছরে ওই কমিটির একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি তাঁর অনাগ্রহের কারণে। সরকারও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার বিবেচনায় হেফাজতে ইসলামের এই মহাপ্রভাবশালী নেতাকে চটাতে চাইছে না। অতএব, কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম সংস্কারের কাজটি পাঁচ বছরে এক কদমও এগোয়নি। সে জন্যই কওমি মাদ্রাসাগুলোর অসাংবিধানিক ‘স্বাধীনতা’ অব্যাহত রয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মহাবিপজ্জনক তা-বের পুনরাবৃত্তি চাইছে না সরকার, সেটা বোধগম্য। কিন্তু অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ হয়? জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করার এবং পশ্চাৎপদতার দুষ্ট চক্রে বন্দী করে রাখার অধিকার কোনো ধর্মীয় নেতাকে বা তাঁর জঙ্গিবাদী শাগরেদদের দেওয়া যেতে পারে না, সরকারকে কথাটি মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। এই ‘অসাংবিধানিক স্বাধীনতা’কে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতেই হবে জাতিকে।

মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.