হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারধর্ম ও দর্শনপ্রচ্ছদ

ঐতিহ্যবাহী চাকমারকুল মাদরাসা নিয়ে কিছু কথা

 

শামসুল হক শারেক … ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া রামু চাকমারকুল কক্সবাজারের কাউমী সিলসিলার অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর প্রতিষ্ঠার পিছনেও রয়েছে একটি সুন্দর এবং বরকতপূর্ণ ইতিহাস। সেই থেকে এ পর্যন্ত এই মাদ্রাসা হাজার হাজার আলেম-মুফাসসির-মুহাদ্দিস ও হাফেজে কোরআন তৈরির মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করে এসেছে।

আমি এখানে সপ্তম শ্রেণী থেকে উলা পর্যন্ত পড়ালেখা করার সুযোগ পেয়েছি। তাফসীরে জালালাইন ও মেশকাত শরীফ আমি এখানে পড়েছি। শাইখুল হাদিস মরহুম আল্লামা আখতার কামাল, মরহুম আল্লামা সুলাইমান, মরহুম আল্লামা জাকের, মাওলানা মুসলিম হুজুর, অত্যন্ত স্নেহশীল আল্লামা ফুরকান ও সৈয়দ আকবর হুজুরের মত ওস্তাদের কাছে আমার এলমে তাফসীর, এলমে হাদিস, উসুলে ফিকহ ও নাহু সরফের সবক পড়ার সুযোগ হয়েছে। আমার জীবনে এটি একটি অন্যতম স্মৃতিময় স্থান।

১৯৭৫ সালে আমি এই মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্র ছিলাম। সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে আমি এই মাদ্রাসার হোস্টেলেই থাকতাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক একটি ঘটনা ঘটে। আর সেটি ছিল বাংলাদেশের স্থপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যা কান্ড।

আমি সেদিন, সেই রাতে রামু চাকমারকুল মাদ্রাসার হোস্টেলেই ছিলাম।
আজকের মত সেসময় মিডিয়ার প্রসার না থাকার কারণে রাতে আমরা কিছু জানতে পারিনি। সকাল বেলা সেই মর্মান্তিক ঘটনার খবর জেনে খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম এবং আমার ছোট মনে সেদিন প্রশ্ন জেগেছিল বাঙালি কত অকৃতজ্ঞ জাতি! একটি স্বাধীন দেশের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতিকে কিভাবে সপরিবারে তারা হত্যা করতে পারল? আর কেনই বা গোটা জাতি সেদিন এই বিয়োগাত্মক ঘটনার প্রতিবাদে প্রতিরোধ গড়ে তুলেনি।

আরো কিছুদিন আগের ঘটনা। সম্ভবত ১৯৭৪ সালের ঘটনা। সড়ক পথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কক্সবাজার আসছিলেন, গাড়িবহর নিয়ে। ঘটনা চক্রে আমি ওই সময় রামু থেকে হেটে হেটে চাকমারকুল মাদ্রাসায় আসছিলাম। আজকের যে বাইপাস সড়কের খালেকুজ্জামান চত্বর বা ফুটবল চত্বর ঠিক সেখানে আমার পিছন দিক থেকে গাড়ি বহরের শব্দ শুনে ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পেছনে ফিরে আমি রাস্তার দক্ষিন দিকে দৌড়ে পালাচ্ছিলাম। আর মোটা চশমা পরা সৌম্য চেহারার একজন মানুষ দেখি আমার ভয়ার্থ অবস্থা দেখে জানালা খুলে হাত নেড়ে আমাকে অভয় দিয়েছিলেন। পরে জানতে পারলাম তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সেই ঘটনায় আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি হয়ে পড়ি আরক্ত ও অনুরক্ত। তাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আমাকে করেছিল প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ ও ব্যতীত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ নেই। তাঁর সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের চার বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল শৃংখল ভেঙ্গে দেশের কাউমী মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানের আসনে বসিয়েছেন।

শত বছর ধরে অবহেলিত কাউমী মাদ্রাসার শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আজ মূলধারায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। তারা বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদ মুক্ত, সন্ত্রাস মুক্ত একটি উন্নত দেশে রূপান্তিত করার সুযোগ লাভ করেছেন।

চাকমারকুল মাদ্রাসা আমার কাছে আরও একটি কারণে স্মৃতিময়। ছবিতে যে পুকুর দেখা যাচ্ছে পুকুরের পূর্ব পাড়ে একটি সেমি পাকা টিনসেড ঘরও দেখা যাচ্ছে। সেদিন আমরা যখন ছিলাম এটি উত্তর-দক্ষিণে আরো লম্বা ছিল এবং বাঁশের বেড়া ও উপরে ছনের ছাউনি ছিল। আমি ওখানে একটি রুমে থাকতাম। সেখানেই জিনের আক্রমন একবার আক্রান্ত হয়ে মারাত্মকভাবে সমস্যায় পড়েছিলাম। জিনের সেই দুষ্ট চক্রটি আমার পিছু ছাড়েনি। ওরা এখনো আমাকে পীড়া দিয়ে থাকে।

জানতে পারলাম, সম্প্রতি চাকমারকুল মাদরাসার শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে ছোটখাটো মতবিরোধ নিয়ে মাদ্রাসায় একটি অচলাবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা হচ্ছে। আমার মতে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমি সকল পক্ষকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানাবো এটি একটি ‘স্মৃতিময় স্থান, দয়া করে ভাঙবেন’ না। নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে বাগানটাকে নষ্ট করবেন না। নিজেদের মান-সম্মান খোয়াবেন না। এতে ইহকাল-পরকাল দুটিই নষ্ট হবে।

মাদ্রাসার বর্তমান মুহতামিম ছোট ভাই মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিকদার, তার বড় ভাই জননেতা চাকমারকুল ইউনিয়ন এর চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম শিকদার, শিকদার পরিবারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নুরুল আলম ও মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক সবাই বয়সে আমার অনেক ছোট। আমি যখন সেখানে ছিলাম বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সিকদার ছিলেন মাত্র কৈশোর পেরিয়ে। বাকি সবাই ছিলেন অনেক ছোট। মাশাআল্লাহ আপনারা সবাই এখন সমাজের বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্ব দিয়ে স্ব-স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত।

এই মাদ্রাসা আমাদের কাছে যেসব কারণে স্মৃতিময় আপনাদের কাছে অনেক কারণে আরো বেশি স্মৃতিময়। কারণ এই মাদ্রাসাটি আপনাদের মুরুব্বীরা বাপ-দাদারাই প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর মাধ্যমে সমাজে ইসলামী শিক্ষার প্রচার প্রসার ও পরকালীন জীবনে মুক্তির আশায় এই মাদ্রাসাটি তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলেই আমরা
জানি।

সুতরাং উনারা যে স্বপ্ন দেখতেন এই মাদ্রাসার মাধ্যমে ইসলামের আলো ছড়িয়ে সমাজকে আলোকিত করার পাশাপাশি পরকালীন জীবনে মহান আল্লাহ সন্তুষ্টি ও মুক্তির। সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য লালন করা এখন আপনাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আল্লাহর ওয়াস্তে কারো প্ররোচনায় ছোটখাটো বিষয়ে মতবিরোধ করে এই মাদ্রাসাটি ধ্বংস করবেন না। আপনাদের মুরুব্বীরা যে লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেখান থেকে আপনারা সরে যাবেন না। আপনারা নিজেরা বসে মতবিরোধ নিরসন করুন।

সাংবাদিক
শামসুল হক শারেক
(চাকমারকুল মাদরাসার সাবেক ছাত্র)।
১৭ মে ২০১৯ ঈসায়ী।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.