হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদফিচার

উলঙ্গ জনপদের হাহাকার

উলঙ জনপদের হাহাকার

ফারুক আজিজ ::: মোরা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। টেকনাফের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। টেকনাফের মানুষের মনের ভেতর দিয়েই বয়ে গেছে। আবাল-বৃদ্ধের কুঁজো চোখের চাহনির সামনে দিয়েই বয়ে গেছে। তরুণ-যুবকের শক্তিমত্তাকে পেছনে ফেলে পরাজয়ের মুকুট পরিয়ে দিয়ে বিজয়ী বেশে আঘাত হেনেছে অস্থিত্বে। শিশুদের আর্ত-চিৎকারের ভেতর ছেদ করে চলে গেছে। মানুষের আশার প্রদিপকে নিভিয়ে দিয়েই বয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষের প্রাণের হৃৎ-এ আঘাত হেনেছে যেমন আঘাত হেনেছে তাদের ভিটে-বাড়ি ও পশু-প্রাণীর ওপর। আল্লাহর বিশেষ রহমতে ঘুর্ণিঝড়ের সাথে জলোচ্ছ্বাসের আবির্ভাব না হওয়ায় অনেকের স্বপ্নের মরণ হলেও প্রাণ নিয়ে বেঁচে আছে। মানুষ মাত্রই বেঁচে থাকতে ভালোবাসে। বেঁচে থাকার জন্যই মানুষ মৃত্যুর সাথে লড়াই করে।

ত্রিশে মে দুই হাজার সতের সাল। খুব ভোরে চট্টগ্রাম, ককসবাজার; টেকনাফ _ বিশেষত উপকূলীয় এলাকায় যে ঘুর্ণিঝড় বয়ে গেছে, প্রতেক্ষদর্শী বয়স্কদের ধারণায় ১৯৮৫ বা ১৯৯১ এর ঘুর্ণিঝড়কে হার মানিয়েছে। মানুষের ঘরবাড়ি, ভিটে- গাছপালা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। উপড়ে ফেলেছে বড় বড় গাছ। মানুষের আর্ত-চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে গেছে। শিশুদের ভয় ভয় চাহনির মাঝে ভয়ের আরেক পৃথিবী অংকিত হয়েছে। গরু-ছাগলের অসহায়ত্বে মানুষের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠেছে। প্রাণীকুল পর্যন্ত একে অপরকে আশ্রয় দিয়েছে। দুর্যোগের ভয়ানক ভয়ে হাঁসের ছানার আশ্রয় হয়েছে বিড়ালের মোলায়েম বুকে। কী ভয়ংকর প্রলয়!!!

বাড়ি থেকে দূরে থাকার কারণে এই ভয়াল দুর্যোগে বাড়ির মানুষের কাছে না থাকার মর্মবেদনা সবার আছে। বিশেষকরে দূর-প্রবাসীর অন্তর খুব ছোট থাকে। কারণ প্রবাসীরা মা-বাবা, পরিবার-পরিজনকে ফেলে প্রবাসে যাওয়ার সোজা অর্থ হলো সন্তান-সন্ততির মুখে হাসি ফোটানো। তাদের মুখে হাসিমুখে দু’মুঠো ভাত তুলের দেয়ার প্রত্যয়ে দেশের মায়া ছিন্ন করে বিদেশের মাটিতে ঘুমায়। আমরা যারা প্রবাসী নই; বা মিনি প্রবাসী তারাও খুব আতংকে ছিলাম। প্রিয় মাতৃভূমির কী অবস্থা!? এই শহরের হাজারো মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগে, এতিম মনে হয় নিজের অস্থিত্বকে। ঘুর্ণিঝড়ের ঘুর্ণনে কি আমাদের মাতৃভূমি আরো উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছে! কতো চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খায় তা ভুক্তভোগী-ই জানে।

ত্রিশে মে ভোর ছ’টার আগে থেকে নেটওয়ার্ক নামক যন্ত্রটি বিকল করে দেয়া হয়েছে। মানুষ আধুনিকতার শীর্ষে অবস্থান করার কারণে এনালগ যুগের রেডিওর কথা ভুলেই গেছে। যার কারণে নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো মা-বাবার সাথে সন্তানের যোগাযোগ। মাতৃভূমির সাথে সন্তানের সম্পর্ক।এদিকে আমাদের মাথায় ভর করে আছে চিন্তার ঘুর্ণিঝড়, ওদিকে মা-বাবা, পরিবার পরিজনের ওপর চলছে প্রাকৃতিক ঘুর্ণিঝড়ের তান্ডব লীলা।
হঠাত এই যোগাযগের বিচ্ছিন্নতা কতো কষ্টের তা কীভাবে কলমের কালি দিয়ে বুঝাবো!?
গায়ের চামড়া ছিঁড়ে ভেতরের একখন্ড গোশত নিয়ে গেলে যে রকম কষ্ট অনুভূত হয় না, তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে হঠাত এই বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগহীনতা।

সকালের ফ্রেম ভেঙে দুপুর। দুপুরের ফ্রেম ভেঙে বিকাল। বিকালের ফ্রেম ভেঙে রাতের আঁধার নেমে আসছে পৃথিবীতে। কিন্তু মাতৃভূমি ও মা-বাবার কোন খোঁজ খবর নেই। রাতের আঁধার মনের ভেতরে শক্ত করে আসন গড়ে নিয়েছে ; ভয়ে ভয়ে চোখের কোণের পানি মুছতে থাকে দূরে থাকা সন্তান বা বাবারা। চোখের নোনতা পানি কপোল বেয়ে মুখে পতিত হলে চিং করে উঠে ; যেনো সাগরের নোনতা পানির ঢল এসে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘর-বাড়ি ও মা-বোনদের!!
কতো শত অজানা দুশ্চিন্তার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে সময়। এক সেকেন্ডের পরিমাণ যেনো এক ঘন্টা। কিছুক্ষণ পর পর সবাই ঢুঁ মেরে দেখে অনলাইনে; এলাকার কোন ছেলে অনলাইনে আছে কী না! কোন তথ্য জানা যায় কি না!!

অবশেষে একদিন পর যা জানা গেলো তা বর্ণনা করা কলমের কালি দিয়ে সম্ভব না। তা বর্ণনা করতে চিত্রে ধারণ করে দেখাতে হবে ; বা তাদের মুখের কথাগুলির অর্থ করার জন্যে নতুন এক ভয়ংকর ভাষার প্রয়োজন হবে। তবুও আমি অধমের ভাষায় সামান্য বর্ণনা:- প্রায় প্রতিটি ঘরের রান্নাঘর নেই, খাবারের ডেকসি নেই, খাওয়ার প্লেট নেই; সর্বোপরি রান্নাঘর যেনো বাড়ির নতুন উঠোন। যাদের ঘর বেড়ার বা একটু দূর্বল তাদের ঘরের অবয়ব নতুন রুপ নিয়েছে। হাজার হাজার সুপারী গাছ ভেঙে গেছে, অন্য গাছগুলি কিছু ছিঁড়ে গেছে, কিছু আবার মূল থেকে উপড়ে গেছে ; কিছুটা আবার অন্যের ঘরে পড়ে ঐ ঘরটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এভাবে উবে গেছে হাজার হাজার মানুষের স্বপন ও বেঁচে থাকার আশ্রয়।

বিশেষত: টেকনাফ উপজেলার প্রতারিত স্থান ও ভূমি শাহ পরীর দ্বীপ। যে এলাকার সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারিত  করা হয়েছে।  রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে মিনি ও পাতি নেতাগনও যে এলাকার সাথে প্রতারণা করে তা যুক্তি দিয়ে বুঝার বিষয় নয়; বরং ঊষাকালের রবির ন্যায় প্রকাশমান ও সত্য যে সবাই যে যেভাবে পারে শাহ পরীর দ্বীপকে বিক্রি করেছে; উলঙ করেছে। বেড়িবাঁধের নাম দিয়ে কতো পকেট ভারি হয়েছে বা কতোবার ধর্ষিতা হয়েছে এই জনপদ উপরওয়ালা ভালো-ই জানে। যে এলাকার সাথে সাগরের কোন বেড়িবাঁধ নেই, সেই এলাকার মানুষের কাছে ঘুর্ণিঝড় মানে কিয়ামত ছাড়া আর কী হতে পারে?!

রোগীর চিকিংসা করার চেয়ে রোগের চিকিংসা বা রোগের কারণ বন্ধ করে দিলে হয়। তারা ত্রাণ নিয়ে কী করবে? ত্রাণ মানেই ত্রাণ। ত্রাণ মানেই এক দুদিনের খাবার অন্যের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া। এখনের ত্রাণের চেয়ে সেলফি বেশি। যতোটাকা দান করে, তার চেয়ে বেশি ফটোসেশন হয়। মনে হয় তারা ফটোসেশনের জন্যে মনে মনে ঘুর্ণিঝড়ের জন্যে অপেক্ষা করে। তবুও এগিয়ে আসুন সমাজের বিত্তশালীরা যাদেরকে আল্লাহ সম্পদ দিয়ে সম্মানিত করেছেন।  রাতের আঁধারে চলে যান অসহায়দের দুয়ারে। এভাবে দান করেন যেনো আপনাদের আরেক হাতও  না জানে। রাজনীতিবিদেরা আপনাদের ফটোসশন বাদ দিন; তা খুব বিরক্তিকর, নোংরা ও ভন্ডামো ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা এভাবে শুধু ত্রাণ নিতে চায় না; তারা প্রাণের নিরাপত্তা চায়, তারা বেড়িবাদ চায়।

ফারুক আজিজ
তরুণ লেখক।
০১৮১৪-৮২০৮৩৩

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.