টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

উখিয়ায় রস্ক প্রকল্পের অর্ধ কোটি টাকা হরিলুট

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১ আগস্ট, ২০১৩
  • ১২১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল থেকে মাঝপথে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে এনে পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে উখিয়ায় ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত আড়াই বছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা দপ্তরের আওতাধীন রিচ আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) নামক প্রকল্পে আনন্দ স্কুলের মাধ্যমে চলমান এ প্রকল্পে অন্তত অর্ধ-কোটি টাকার ব্যাপক লুটপাট ও আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। উখিয়ায় ১৪৫টি আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার কথা থাকলেও অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রীও বিদ্যালয়ে আসেনা। ২০১৩ সালের ১ম চার মাসে প্রথম সেমিস্টারে শিক্ষকদের বেতন, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, ঘরভাড়া, শিক্ষার্থীদের পোষাকখাতে প্রায় ৪৪ লক্ষ টাকা সংশ্লিষ্টরা ভূঁয়া রেজুলেশন, বিল ভাউচার দিয়ে উত্তোলন করে আত্মসাতের পাঁয়তারা করছে খবর পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় উপজেলা শিক্ষা ও নির্বাহী অফিস এ ব্যাপারে কারা কোথায় কি করছে, কিভাবে স্কুল চলছে তা জানেন না। প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে উখিয়ায় রস্ক প্রকল্পের মনিটরিং ও প্রশিক্ষণের জন্য দুই জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানা গেলেও ৭ মাস পার হওয়ার পরেও তারা এলাকায় আসেনি। সরেজমিনে কক্সবাজারের উখিয়া সদর রাজাপালং ইউনিয়নের মো: আলী ভিটা এলাকায় নবী আলমের বাড়ী আনন্দ স্কুল, ঘোনারপাড়া আনন্দ স্কুল, পশ্চিম মাছকারিয়া আনন্দ স্কুল, পশ্চিম বটতলী আনন্দ স্কুল ও চাকবৈঠা আনন্দ স্কুল, পালংখালী ইউনিয়নের তাজনিমারখোলা আনন্দ স্কুল, বটতলী আনন্দ স্কুল, গৌজঘোনা আনন্দ স্কুল, রতœাপালং ইউনিয়নের পশ্চিম রতœা সাদৃকাটা আনন্দ স্কুল, জাফর পল্লান পাড়া আনন্দ স্কুল, পশ্চিম রতœা অমল বড়–য়ার বাড়ি আনন্দ স্কুল, হেলাল খোন্দকারের বাড়ী আনন্দ স্কুল, পশ্চিম রতœার ঝাউতলা আনন্দ স্কুল, সর্দারপাড়া বাদশা মিয়ার বাড়ি আনন্দ স্কুলসহ ৫ ইউনিয়নে অনুমোদিত ১৪৫ টি আনন্দ স্কুলের মধ্যে ২১টির মত স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। ঝরে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার জন্য গৃহীত রস্ক প্রকল্পের অধীন আনন্দ স্কুলগুলোর ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০১১ সালের শুরুতে উখিয়ার ৫ ইউনিয়নের মধ্যে ১নং জালিয়াপালং ইউনিয়নে ৩০টি আনন্দ স্কুল কেন্দ্র, মোট ছাত্র-ছাত্রী ৯৪০ জন, ইএসপি হেলপ, কক্সবাজার। ২নং রতœাপালং ইউনিয়নের ২৬টি কেন্দ্রে  মোট ছাত্র-ছাত্রী ৩৪৭ জন, ইএসপি টাঙ্গাইল সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। ৩নং হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ২৫টি কেন্দ্রে মোট ছাত্র-ছাত্রী ৭৮৬ জন, ইএসপি ডিসিআরডিসি। ৪নং রাজাপালং ইউনিয়নের ৩৫টি কেন্দ্রে মোট ছাত্র-ছাত্রী ১৩৪৭ জন, ইএসপি পালস্ বাংলাদেশ। ৫নং পালংখালী ইউনিয়নের ২৯টি কেন্দ্রে মোট ছাত্র-ছাত্রী ৮৩৮ জন মিলিয়ে সর্বমোট ২৪২৬ জন, ইএসপি আলোকন। ৫ ইউনিয়নের ১৪৫টি আনন্দ স্কুল কেন্দ্রের মাধ্যমে ৪ হাজার ২৬০ জন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ইতিপূর্বে ঝরে পড়া ৭ বছরের ঊর্ধ্বে ১৪ বছর বয়সী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী অনুমোদন লাভ করে। নানা অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে ১৪৫টি আনন্দ স্কুল কেন্দ্রের মধ্যে ২১টি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকলেও উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে ৭টি স্কুল বন্ধ বলে জানানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে সরেজমিনে দেখা গেছে, মোট ১৩৮টি চালু স্কুলের মধ্যে ৮০ শতাংশ বিদ্যালয়ের অবস্থান কারো না কারো বাড়ী ঘরে, বারান্দায়। যেসব ঘরের অনুকুলে স্কুল অনুমোদিত সেসব ঘরের ছেলেমেয়ে, বউ বা নিকটাত্মীয়রা শিক্ষক ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটিতে সংশ্লিষ্ট। সে অনুযায়ী এসব বিদ্যালয় নামক ঘরোয়া বৈঠকে নিজেদের পরিবার পরিজনের শিশুদের পারিবারিকভাবে পড়ানোকে বিদ্যালয় বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক বিদ্যালয় অনিয়মিত। নিয়োজিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সিংহভাগ বিভিন্ন এনজিও সহ নানা পেশায় ব্যস্ত থাকায় কোন কোন স্কুলে বর্গা শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবী, ভাবী-দেবর, ননদদের দিয়ে চালায়। অন্যথায় এগুলো প্রায় সময় বন্ধ থাকে বলে স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, আনন্দ স্কুলের নামে কুমির ছানার আদলে প্রকল্পের ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম করা হচ্ছে। আনন্দ স্কুলগুলোতে ভর্তিকৃত অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক, নিন্ম মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। পালংখালী ইউ,পি, চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী, অনেক সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও চৌকিদারসহ সচেতন লোকজন বলেন, কোথায় কারা কি স্কুল চালাচ্ছে, তা আমরা জানিনা। স্কুল চলে কিনা জানিনা তবে যারা চালায় বলছে তারাতো ভালই চলছে। রাজাপালং ইউনিয়নের চাকবৈঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মাদার স্কুলের তদারককারী দায়িত্বপ্রাপ্ত মো: ছৈয়দুর রহমান বলেন, আমার বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকায় চাকবৈঠা আনন্দ স্কুলটি গত ৭/৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। অনুমোদিত শিক্ষিকা নাসরিন জাহান অন্যত্র চাকরি করায় বিকল্প কেউ কেন্দ্র চালায় না। একই ইউনিয়নের ফলিয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে ছেলেটা অর্থাৎ ফরিদুল আলম আমার ক্যাচমেন্ট এলাকায় তথাকথিত দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহির করে কি করছে তা জানানোর প্রয়োজন মনে করে না। গত দুই বছর ধরে বন্ধ স্কুল ও অনুপস্থিত শিক্ষক-ভূঁয়া ছাত্রছাত্রীদের নামে ভূঁয়া বিল ভাউচার দিয়ে কোন ধরনের তদারকি ছাড়া ৪টি বন্ধ, অনিয়মিত বিদ্যালয়ের নামে বিপুল পরিমাণের সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উক্ত টাউট ফরিদ সরকারি টাকা আত্মসাতের লোভে আমার স্বাক্ষর ও সীল জাল করে জালিয়তির আশ্রয় নিয়ে অপকর্ম করে যাচ্ছে। অভিযুক্ত ফরিদ আলমের বিরুদ্ধে ৫ ইউনিয়নের ১৩৮টি অনুমোদিত কেন্দ্রের শিক্ষক, ঘর ভাড়া, শিক্ষা উপকরণ, উপবৃত্তি, পোষাক সরবরাহসহ প্রত্যেক খাত থেকে মোটা অংকের কমিশন নিয়ে এ ধরনের জাল-জালিয়তি করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে উক্ত ফরিদুল আলম বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের টাকা কিভাবে ব্যয় হচ্ছে তা নিয়ে অফিসের কোন মাথাব্যাথা না থাকলেও সাংবাদিকদের কেন এত মাথাব্যাথা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিল ও স্বাক্ষর জালিয়তি করে বন্ধ স্কুলের নামে অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাতের ব্যাপারে তিনি কোন সদোত্তর দিতে পারেনি। রতœাপালং ইউ,পি, চেয়ারম্যান নুরুল কবির চৌধুরী সহ সচেতন লোকজন বলেন, আমার পরিষদের কাছে পশ্চিম রতœা ঝাউতলা আনন্দ স্কুলটি প্রায় সময় বন্ধ থাকে। এসব স্কুলগুলো সুষ্ঠু তদারকি, জবাবদিহিতা না থাকায় কথিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মনগড়া তথ্য নির্ভর হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগসাজসে এ ধরনের অপকর্ম চালানো হচ্ছে। চলতি ২০১৩ সালে উল্লেখিত সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীদের অনুকুলে পোষাক বাবদ মাথাপিছু ৪শত টাকা হারে বরাদ্দ এসেছে। বরাদ্দকৃত টাকা কয়েক মাস ধরে ব্যাংকে পড়ে থাকলেও গত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে স্বচ্ছতার অভাবে এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। নিয়ম অনুযায়ী এসব পোষাক স্থানীয় স্কুল ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক সরবরাহ করার কথা। কিন্তু সিংহভাগ স্কুলে ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা এসএমসি’র অস্তিত্ব না থাকায় বা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ায় তাদের বিকল্প হিসাবে অন্যভাবে পোষাক সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিস থেকে জানা গেছে। গত বছর পালংখালী, রতœাপালং ও জালিয়াপালং ইউনিয়নের কিছু কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে নিম্ন মানের পোষাক ও উপকরণ সরবরাহ করা হলেও সিংহভাগ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। তবে রাজাপালং ও হলদিয়াপালং ইউনিয়নে কোন পোষাক বা উপকরণ সরবরাহ দেওয়া হয়নি। অথচ এ দুই ইউনিয়নের ৫৯টি স্কুলের পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ইএসপি বা শিক্ষা সহায়তা প্রদায়ক সংগঠন এনজিওগুলো এ খাতের পুরো টাকায় আত্মসাৎ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে শিক্ষা অফিস থেকে উক্ত ইএসপি, ডিসিআরডিসি ও পালস্ বাংলাদেশকে উত্তোলিত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসের আনন্দ স্কুলের দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো: সাহাব উদ্দিন বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসের সাথে রস্কের আনন্দ স্কুল কার্যক্রমের কারো সাথে সমন্বয় নাই। তবে ৪০ শতাংশের নিচে ছাত্র-ছাত্রী বর্তমানে স্কুলগুলোতে বিদ্যমান আছে বলে জানতে পেরেছি। বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে গত বছর উখিয়া আনন্দ স্কুলের জন্য বরাদ্দকৃত ৮৮ লক্ষ টাকার মধ্যে ২০ লক্ষ টাকা ফেরত প্রদান করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ইএসপি’র সংশ্লিষ্টতা না থাকায় কার্যত রস্ক প্রকল্পের আনন্দ স্কুল কার্যক্রম চলছে দায়সারাভাবে। আনন্দ স্কুলের ব্যাপারে নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসের কাছ থেকে যাবতীয় তথ্যাদি চাওয়া হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম জানান। অনুমোদিত সকল আনন্দ স্কুলের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন না হওয়া পর্যন্ত পোষাক ও অন্যান্য সাথে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় দেওয়া হবেনা বলে তিনি জানান।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT