ঈদের দিন: করণীয় ও বর্জনীয়

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট, ২০১২ ১১:৪০ : অপরাহ্ণ

তামীম রায়হান…শুধুই আল্লাহর নামে আল্লাহর দেওয়া দানে ধন্য হয়ে আনন্দ প্রকাশের এক অপূর্ব উৎসব আমাদের ঈদুল ফিতর। পুরো রমজান জুড়ে সংযমী থেকে পরিশুদ্ধ হৃদয়ে কলুষমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকারে একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরার এমন আবেগ আর কে দিয়েছে আমাদের?এ মহিমান্বিত খুশির দিনটিকে বরণ করে নেওয়ার জন্য রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মনীতি।ঈদকে সত্যিকার অর্থে পরম করুণাময়ের কাছে গৃহীত করতে চাইলে এ বিষয়গুলোও মনে রাখা প্রয়োজন-
১. ঈদের দিন যেন কেউ কোন প্রকার রোযা না রাখে। কারণ এটি হবে ঈদের সঙ্গে চরম ধৃষ্টতা এবং আল্লাহর নেয়ামত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার শামিল। এ বিষয়ে বুখারী শরীফে স্পষ্ট নিষেধ রয়েছে।

২. ঈদের দিনটি তো আল্লাহ পাকেরই দান। তাই এ দিন বেশি বেশি তাকবির পাঠ করে আল্লাহকে ডাকার মধ্যেই প্রকৃত আনন্দ। ঈদের নামাজের জন্য রওয়ানা হওয়ার সময় এবং নামাজের অপেক্ষার সময়গুলোতেও এ তাকবিরে তাশরিক পাঠ করতে থাকুন। রাস্তাঘাটে যাওয়ার সময় উচ্চ শব্দে তাকবির বলুন।

৩. তবে এর আগে পরিষ্কারভাবে গোসল করে পবিত্র হওয়া এবং নিজের সাধ্যের মধ্যে থেকে সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরিধান করুন।

৪. নিজের এবং নিজেদের চারপাশের সবকিছুকে সুন্দর করে সাজানো ও সুগন্ধিময় করে রাখা উচিৎ, এসব বিষয়ে এ দিন কোনো ধরনের কৃপণতা কাম্য নয়। আল্লাহ পাক আপনাকে যেসব নেয়ামত দান করেছেন এবং যে ধন সম্পদ আপনাকে দিয়ে সম্মানিত করেছেন সেগুলো লুকিয়ে রাখাকে তিনি অপছন্দ করেন।

আল্লাহ পাকের বান্দারা তার দেয়া উৎসবে খুশী হয়ে তার বিধানমতো তারই দান করা সুন্দর পোশাক পরে তার নাম জপতে জপতে ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে কেবলই তার ডাকে সাড়া দিতে- এমন দৃশ্য আল্লাহ পাকের কাছে বড়ই আনন্দময় এবং ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করার বিষয়।

৫. ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে কিছু খেয়ে নেওয়া সুন্নত। বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রা.) এর বর্ণনায় রয়েছে, রাসুল (সা.) বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদের নামাজের জন্য বের হতেন। আমাদের দেশি খাবার- সেমাই-ফিরনীর পাশাপাশি কয়েকটি খেজুরও রাখতে পারেন, তাতে অন্তত এ সুন্নতটিও আদায় হয়ে গেল। মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায়ও রয়েছে, রাসুল (সা.) কিছু না খেয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে যেতেন না।

৬. ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহের উদ্দেশে পায়ে হেঁটে যাওয়া ভালো। তিরমিযী শরীফের এক হাদীসে হযরত আলী (রা.) এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, ঈদগাহের দিকে হেঁটে যাওয়া সুন্নত এবং কিছু খেয়ে বের হওয়া সুন্নত।

৭. ঈদগাহে যাওয়া এবং নামাজ শেষে ফেরার সময় ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা ব্যবহার করা সুন্নত। এক রাস্তা দিয়ে যাবেন একটু ঘুরে হলেও আরেক রাস্তা দিয়ে ঘরে ফিরবেন। বুখারী শরীফের বর্ণনায় হযরত জাবের (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ঈদের দিন রাস্তা পরিবর্তন করতেন।

৮. ঈদের দিন রাস্তাঘাটে পরিচিত অপরিচিত সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করাও সুন্নত। এতে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়, সম্প্রীতি ও ভালোবাসা তৈরি হয়। ঈদ মুবারক, ঈদ আনন্দময় হোক, প্রতিটি প্রহর আপনি সুখী হোন- এ জাতীয় বাক্য বলে একে অপরকে সম্ভাষণ জানাতে পারি।
৯. পরিবারের সবার সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরার টাকা আদায় হয়েছে কিনা, খোঁজ নিন। কারো অনাদায় থাকলে তাকে স্মরণ করিয়ে দিন। ঈদের নামাজের আগে যেন তা দান করা হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। পরেও আদায় করা যায়, তবে নামাজের আগে আদায় করা উত্তম।

১০. ফিতরার টাকা ছাড়াও গরিব মিসকিন অসহায়কে দান করুন। নিজের হাতে এবং ছোট বাচ্চাদের হাতে দিয়েও দান করাতে শেখান।

১১. রাসুল (সা.) এর সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন একে অপরকে বলতেন, আল্লাহ আমার এবং আপনার তরফ থেকে এ আনন্দকে কবুল করুন। ঈদের দিন এমন আনন্দ ও অনুভূতি প্রকাশ করাও ইসলামের অংশ। তবে এসবের কোনো বিষয়েই যেন আমাদের সীমালঙ্ঘন না হয়, সেদিকে সতর্ক ও সচেতন দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

১২. ঈদের আনন্দ মানে শুধু খাওয়ার আয়োজন নয়, হাসিমুখে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করুন। পাড়া প্রতিবেশি থেকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে সালাম মুআনাকা করুন।

কল্যাণের পথে কোনো অপচয় নেই, এ কথা সত্য। তবে ঈদের যাবতীয় আনন্দের সবটুকু যেন হয় আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার ভেতরে, নয়তো উল্টো তা পরম করুণাময়ের নাখোশ হওয়ার কারণ হবে।

আজকাল ঈদের সময়ে অতি আধুনিক তরুণ বন্ধুরা রাস্তা ও মোড়ে কানা ফাটানো শব্দযন্ত্র বসিয়ে বিদেশি গানের আয়োজন করে থাকেন, বিষয়টি যে শুধু ইসলাম বিরুদ্ধ তা নয় বরং এতে অন্য অনেক মানুষের ক্ষতিও হয়ে থাকে, নিজেদের হালাল আনন্দের কপালে এমন কালো দাগ বসানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের এ ব্যস্ত জীবনে ঈদের দিন নিজেদের আপনজনদের সঙ্গে মেলামেশার অপূর্ব সুযোগ। তাই শুধুই টিভি নাটকে বুঁদ হয়ে না থেকে যতদূর সম্ভব যে যেখানে আছেন, সবার সঙ্গে দেখা করুন, অসুস্থ কিংবা বয়স্কদের কাছে গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিন। বাচ্চাদেরও এসব পালনে উৎসাহিত করুন। এটুকু সামাজিক ভালোবাসাই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনেকদিন।

সব ধরনের কৃত্রিমতা ও লৌকিকতার মুখোশ ঝেড়ে ফেলে অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠার আহ্বান জানায় ঈদুল ফিতর। তাই আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.) আদর্শের সীমানা ডিঙিয়ে যাতে এর কোনো অমর্যাদা না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন আমাদেও সবার।


সর্বশেষ সংবাদ