ইয়াবা কিং মোস্তাকের বাড়ির মালামাল ক্রোক বাড়ি সীল গালা করেছে পুলিশ

প্রকাশ: ২৮ মে, ২০১৯ ১২:৫২ : পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ইয়াবা পাচারের ঘটনায় ১৩টি মামলা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ইয়াবা গড ফাদার রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের মেম্বার মোস্তাক আহম্মদদের বসতবাড়িতে অভিযান চালিয়েছে রামু থানা পুলিশ। এসময় বাড়ি সব মালামাল ক্রোক করা হয় এবং বাড়িটি সীল গালা করা হয়েছে। সোমবার ২৭ মে সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত এ অভিযান চলে। মাদকের টাকায় গড়া বিলাস বহুল আসবাবপত্র গুলো ক্রোক করে তা রামু থানা নিয়ে আসা হয়েছে।
জানা গেছে, রামু থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ আবুল মনছুর এর নেতৃত্বে একদল পুলিশ ও ব্যাটালিয়ন পুলিশ সদস্যরা খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মদের পূর্বগোয়ালিয়াস্থ বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
আদালতের নির্দেশে তার সোমবার সকাল ১১ টা থেকে বেলা ৪টা পর্যন্ত ইয়াবা ডন মোস্তাকের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। ইয়াবা টাকায় গড়া, বাড়ির মালামাল, ফার্নিচার, টিভি ফ্রিজ থেকে শুরু করে তার সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয় এবং বাড়িটি সীলগালা করে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রামু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আবুল মনছুর অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঢাকা মেট্টোপলিটন (ডিএমপি) পুলিশ এর কলাবাগান থানার মামলা নাম্বার- ৯(১০)১৮ ধারা ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এর ১৯ (১) এর -৯(খ) /২৫ এবং জি আর মামলা নং- ১১৪৫/১৮ইং
এর ক্রোকি পরোয়ানা জারি করে আদালত। আদালতে ক্রোকি পরোয়ার অনুবলে মোস্তাক আহমেদ পিতা-আস্কর মিয়া, মাতা-রশিদা বেগম, সাং-পূর্ব গোয়ালিয়া পালং, থানা-রামু, জেলা-কক্সবাজার। তার এর বাড়ি থেকে তার সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়।
তিনি জানান, সব মালামাল মিনি ট্রাক যোগে (ডাম্পার) রামু থানা হেফাজতে নিয়ে আসা হয়েছে।
ওসি আরো জানিয়েছেন, মোস্তাক খুবই ধুরন্ধর। তার বিরুদ্ধে রামু, কক্সবাজার, ঢাকাসহ বিভিন্ন থানায় ১৩টির অধিক ইয়াবা মামলা আছে।
জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ করে রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের এই মোস্তাক আহামদ মুরগীর সাথে ইয়াবা পাচার করে হয়েছেন কোটিপতি। কোটি টাকা খরচ করে হয়েছেন ইউপি সদস্য। একের পর এক ইয়াবা মামলার আসামী হয়েও রয়েছেন ধরাছোয়ার বাইরে। প্রকাশ্যেই করছেন রাজনীতি, অংশগ্রহন করছেন সভা সমাবেশে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখনো প্রতি সপ্তাহে দুই বার করে ঢাকায় ইয়াবা পাচার করছে। ভয়ংকর ইয়াবা গডফাদার মোস্তাকের সা¤্রাজ্য এখনো অক্ষত রয়ে গেছে। কক্সবাজার ও ঢাকার বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ডজনাধিক মামলা। ২০১৮ সালের ৮ ও ১৩ অক্টোবর দুই দফায় ঢাকায় র‌্যাব ও পুলিশের হাতে মোস্তাকের সহযোগীরা ইয়াবা সহ আটক হলেও পালিয়ে গেছেন গডফাদার মোস্তাক। এঘটনায়ও মামলা হয় মোস্তাকের বিরুদ্ধে।
গত বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে ঢাকায় দুইটি ইয়াবা মামলার আসামী হয়েও কক্সবাজারে প্রকাশ্যেই আছেন মোস্তাক। মাঝে মাঝে আত্মগোপনে চলে গেলেও এখন প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করে ইয়াবা সামরাজ্য ঠিকিয়ে রেখেছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারী সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের হাতে ১০২ ইয়াবা কারবারী আত্মসর্ম্পণ অনুষ্টানেও মোস্তাককে অনেকে দেখেছে বলে প্রকাশ।
তালিকাভূক্ত শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী এই মোস্তাক রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার। অভাবের তাড়নায় এই মোস্তাক আনসার সদস্য হিসেবে চাকরি শুরু করলেও অল্প টাকায় সন্তুষ্ট হতে না পেরে চাকরি ত্যাগ করেন। শুরু করেন মিয়ানমারের চোরাই পণ্যের ব্যবসা। সেখানেও তার ভাগ্য খুলেনি। পরে শুরু করে মুরগীর ব্যবসা। একই সময় জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা পাচারে। এক সময়ের মুরগীর বিক্রেতা মোস্তাক এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, গড়ে তুলেছে বিত্তবৈভব, গাড়ি, বাড়ি, ফিশিং বোটসহ আরো অঢেল সম্পদ, কোটি টাকা খরচ করে হয়েছেন জনপ্রতিনিধিও।
তালিকাভুক্ত ইয়াবা চোরাকারবারি মোস্তাক আহমদ ওরফে ইয়াবা মোস্তাক। তার বাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব গোয়ালিয়াপালং এলাকার আশরাফ মিয়ার ছেলে। তার বাবা আশরাফ মিয়া পেশায় কাঠুরিয়া। কয়েক বছর আগেও খেয়ে না খেয়ে জীবন গেছে তাদের। কিন্তু এখন ইয়াবার কল্যাণে কাঠুরিয়া বাবার সংসারকে কোটিপতির কাতারে নিয়ে গেছেন মোস্তাক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দরিদ্র বাবার টাকায় অল্প পড়াশোনা করে আনসার বাহিনীতে যোগ দেন মোস্তাক। ছোটবেলা থেকেই লোভী প্রকৃতির ছিলেন তিনি। এ কারণেই মাত্র তিন বছরের মাথায় ছেড়ে দেন অল্প বেতনের আনসার সদস্যের চাকরি। এরপর তার বড় ভাই মনসুরের হাত ধরে মিয়ানমারের চোরাই পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন। মরিচ্যা বাজার এক সময় ছিলো চোরাইপণ্য পাচারের ঘাটি।
শুরু থেকেই মিয়ানমার সীমান্ত থেকে চোরাই পথে কাপড়, আচার, বিয়ার, মদসহ নানা পণ্য নিয়ে আসে। টানা এক বছর চোরাই পণ্যের কারবার করে সীমান্তের সকল অবৈধ পথ রপ্ত করেন। এক পর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা পাচারে। সামান্য সংখ্যায় ইয়াবা নিয়ে পাচার শুরু করেন মোস্তাক। শুরুর দিকে তিনি নিজেই পাচার করতেন। ওই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে খুচরা বিক্রিও করতেন ইয়াবা।এলাকাবাসি জানান, মোস্তাকের বড় ভাই মনসুর গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুরগি সংগ্রহের ব্যবসাও করেন। ভাইয়ের সঙ্গে মুরগি সংগ্রহের আড়ালে মোস্তাক খুচরা ইয়াবা করেন। পরে তিনি ইয়াবা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন।
সূত্রমতে, ইয়াবা জগতে মোস্তাক পা দেন হ্নীলার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদের হাত ধরে। মোস্তাক ছিলেন নুর মোহাম্মদের অন্যতম সহযোগী। তবে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নুর মোহাম্মদ নিহত হওয়ার পর ওই সিন্ডিকেট ছেড়ে নিজেই একটি ইয়াবা পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিন্ডিকেটে মোস্তাকের অন্যতম সদস্য হিসাবে সম্পৃক্ত করে তার বড় ভাই মনসুর, ঈদগড় ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধির ভাই হাফেজ শহিদুল ইসলাম, খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আবু তাহের টুলু, আরমান, আবদুল গণি, সাইফুল ও মিজান সহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে। এদের মধ্যে ইয়াবা নিয়ে অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। সেই সময় প্রমাণ মেলে ওই ইয়াবাগুলো ছিল মূলত মোস্তাকের।
মোস্তাক সিন্ডিকেটের অনেকে গ্রেফতার হলে, সিন্ডিকেট শক্তিশালি করনে যোগদেন সিএনজি জাফর, মিজান, সাইফুলসহ আরো কয়েকজনকে। তার ইয়াবা বহনকারী হিসেবে ছিলো খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পুর্ব গোয়ালিয়া পাহাড় পাড়ার আবদুল গণি। তার বাবাও একজন পেশায় চিহ্নিত ডাকাত ছিলেন। কিন্তু মোস্তাকের সাথে দীর্ঘ প্রায় ১ বছর ইয়াবা ব্যবসার পর এই আবদুল গণি এখন নিজেই একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। গণির বেশির ভাগ ইয়াবা উত্তর বঙ্গে পাচার করে আসছে। আর টাকা আসে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। তার ছেলে নিয়মিত কুরিয়ার সার্ভিস থেকে টাকা উত্তোলন করে। নব্য এই ইয়াবা কারবারী মোস্তাকের হাত ধরে এখন অন্তত ১০ কোটি টাকার মালিক। কিনেছে গাড়ী, জমি। স্থানীয় লোকজনও তার এই উত্তান দেখে হতবাক। কিন্তু এরা এখনো অধরা। বর্তমানে বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন ইয়াবা ব্যবসা।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, মোস্তাক নিজেই কক্সবাজারের রামু ও উখিয়া থেকে প্রতি সপ্তাহে দুইবার ঢাকায় ইয়াবা পাচার করে থাকেন। ঢাকায় ইয়াবা পাচারের সময় মোস্তাকের সাথে থাকে আরো ৩-৪ জন সহযোগী। তারা ঢাকার মোহাম্মদপূরের বসিলা এলাকায় ফ্ল্যাট নিয়ে ইয়াবা ব্যবসা করে। ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার একটি ইয়াবা সিন্ডিকেটের সাথে যৌথভাবে মোস্তাক ইয়াবা ব্যবসা করে।
ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, গত বছরের ৮ অক্টোবর র‌্যাব বসিলা মডেল টাউনের একটি ফ্লাটে ইয়াবা ব্যবসায়ীর আস্তানায় অভিযান চালায়। এই সময় সিন্ডিকেট প্রধান মোস্তাক ও প্রধান সহযোগি ওমর ফারুক পালিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার হন নুরুল আমিন ও আবদুল করিম নামের মোস্তাকের দুই সহযোগী। তাদেরকে ১০ হাজার ইয়াবা সহ আটক করা হয়। এই সময় জব্ধ করা হয় ইয়াবা ব্যবসার ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই ঘটনায় আটক দুইজন ও গডফাদার মোস্তাক সহ ওই সিন্ডিকেটের ৯ সদস্যের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন র‌্যাব।
র‌্যাবের হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও থামেনি মোস্তাকের ইয়াবা ব্যবসা। উল্টো ৫ দিন পরে আবারও উখিয়ার মরিচ্যা থেকে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় যায় মোস্তাক ও ওমর ফারুক নামের আরেক কারবারী।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জানান, গত বছর ১৩ অক্টোবর রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর গোলাপবাগ মাঠের পাশে র‌্যাব অভিযান চালালে ইয়াবা গডফাদার মোস্তাক পালিয়ে যায়। তবে তার প্রধান সহযোগী ওমর ফারুক ও কামরুল ইসলাম ৭ হাজার পিস ইয়াবা সহ র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে। এই ঘটনায়ও র‌্যাব বাদি হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায়ও মোস্তাককে আসামী করা হয়।
এভাবে ইয়াবা ব্যবসার ঘটনায় মোস্তাকের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারী সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের হাতে ১০২ ইয়াবা কারবারী আত্মসর্ম্পণ অনুষ্টানেও দু:সাসিক মোস্তাককে অনেকে দেখেছে বলে প্রকাশ।
সর্বশেষ ২৭ মে সোমবার এই ইয়াবা ডন মোস্তাকের বাড়িতে চালানো হলে পুলিশের অভিযান। ক্রোক করা হয় বাড়ির সমস্ত মালামাল। সীলগালা করা হয়েছে বাড়িটি।


সর্বশেষ সংবাদ