হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

অর্থ-বাণিজ্যধর্ম ও দর্শনপ্রচ্ছদফিচার

ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাতের গুরুত্ব ও বণ্টনব্যবস্থা

জাকাত ইসলামীpic-02_237865 সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। জাকাত একদিকে দরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

আরবি জাকাত শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে জাকাত বলতে ধনীদের ধন-মালে আল্লাহর নির্ধারিত অংশকে বোঝায়। আল্লাহ তাআলা সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে নির্ধারিত আটটি খাতে ব্যয়-বণ্টন করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

বস্তুত জাকাত একদিকে জাকাতদাতার মন ও আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে, তার ধন-সম্পদকেও পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে দেয়; অন্যদিকে দরিদ্রদের অভাব পূরণে সহায়তা করে এবং সম্পদে ক্রমবৃদ্ধি বয়ে আনে।

জাকাতের ব্যাপারে কোরআন-হাদিস কী বলে

পবিত্র কোরআনে এসেছে : ‘সম্পদ যেন কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর : ৭)

‘আমার রহমত সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে। অচিরেই আমি তা লিখে দেব সেই লোকদের জন্য, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতগুলোর প্রতি ইমান রাখে।’ (সুরা আ’রাফ : ১৫৬)

‘তুমি তাদের ধন-মাল থেকে সাদাকাহ (জাকাত) গ্রহণ করো, যা তাদের পবিত্র করে দেবে।’ (সুরা তওবা : ১০৩)

হাদিস শরিফে এসেছে : ‘কেউ যদি আল্লাহর পুরস্কারের আশায় জাকাত দেয়, তাহলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু যে জাকাত দিতে অস্বীকার করবে, তার কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে জাকাত আদায় করতে হবে।’ (আহমদ, নাসাঈ ও বায়হাকি)

‘যে তার সম্পত্তির ওপর জাকাত দিল, সে যেন তার সব পাপ ধুয়ে ফেলল।’ (তাবারানি ও হাকিম)

‘আল্লাহ যাকে ধন দিয়েছেন, সে যদি জাকাত আদায় না করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে, যার দুই চোখের ওপর দুটি কালো চিহ্ন থাকবে। বলবে, ‘আমিই তোমার ধন-মাল, আমিই তোমার সঞ্চয়।’ (বুখারি)

জাকাতের ধর্মীয় গুরুত্ব

জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে, বিত্তশালীদের পরিশুদ্ধ করে, দারিদ্র্য মোচন করে, উৎপাদন বৃদ্ধি করে, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে এবং সমাজে শান্তি আনে। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে জাকাত। ইমানের পর নামাজ এবং এর পরই জাকাতের স্থান। কোরআন মজিদের ৩২ জায়গায় জাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৮ জায়গায় নামাজ ও জাকাতের উল্লেখ একত্রে করা হয়েছে। বস্তুত, ইসলামে নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো অবকাশ নেই। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের একসঙ্গে আদেশ করা হয়েছে নামাজ কায়েম করা ও জাকাত দেওয়ার জন্য।’ এ কারণে ইসলাম জাকাত আদায়ের জন্য কঠোর বিধান দিয়েছে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) জাকাত না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

জাকাত কারা দেবেন

ইসলামী আইনবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে জাকাত কেবল স্বাধীন, পূর্ণ বয়স্ক মুসলিম নর অথবা নারী, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার ওপর নিম্ন শর্তসাপেক্ষে জাকাত ধার্য হবে। শর্তগুলো হচ্ছে : এক. সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা। দুই. সম্পদ উৎপাদনক্ষম ও বর্ধনশীল হওয়া। জাকাত ধার্য হওয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। নিসাব বলা হয় শরিয়ত নির্ধারিত ন্যূনতম সীমা বা পরিমাণকে। সাধারণভাবে ৫২.৫০ তোলা রুপা বা ৭.৫০ তোলা সোনা বা এর সমমূল্যের সম্পদকে নিসাব বলা হয়। কারো কাছে ৭.৫০ তোলা সোনা বা ৫২.৫০ তোলা রুপা থাকলে বা উভয়টি মিলে ৫২.৫০ তোলা রুপার মূল্যের সমান অথবা সব সম্পদ মিলে ৫২.৫০ তোলা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে সে সম্পদের জাকাত দিতে হবে। চার. সারা বছরের মৌল প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই কেবল জাকাত ফরজ হবে। পাঁচ. জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য ঋণমুক্ত হওয়ার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা শর্ত। ছয়. কারো কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকলেই কেবল সে সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে।

কোন কোন সম্পদে জাকাত দিতে হয়

সোনা-রুপা : সোনা-রুপার মধ্যে পিণ্ড আকারে রক্ষিত, সোনা-রুপার বাসন, অলংকার, এসবের বানানোর মূল্য হিসাব করে ৭.৫০ শতাংশ হিসাবে জাকাত দিতে হবে।

নগদ অর্থ : হাতে এবং ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে।

ব্যবসায়ের মালামাল : ব্যবসায়ের মালামালের জাকাত নিরূপণকালে বছর শেষে হিসাব সমাপ্তি দিবসে যে সম্পদ থাকবে তাই সারা বছর ছিল ধরে নিয়ে তার ওপর জাকাত দিতে হবে।

কৃষি ফসল : কৃষি ফসলের ক্ষেত্রে প্রত্যেক শ্রেণির ফসলের নিসাব পৃথকভাবে হিসাব করে নিসাব পরিমাণ ফসল থেকে জাকাত (উশর) দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ধান যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, পাট যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, তাহলে ফসল তোলার সময়ই তার জাকাত দিতে হবে। তেমনিভাবে কলাই, সরিষা, মধু ইত্যাদি প্রতিটির নিসাব পৃথকভাবে ধরতে হবে ।

খনিজ সম্পদ : খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে কোনো নিসাব নেই। খনিজ সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় থাকলে সম্পদ উত্তোলনের পরই হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। খনিজ সম্পদের জাকাতের হার হচ্ছে ২০ শতাংশ।

গরু-মহিষ : নিজের কাজে খাটে এবং বিচরণশীল বা ‘সায়েমা’ নয় এমন গরু-মহিষ বাদ দিয়ে ৩০টি হলেই তার ওপর জাকাত দিতে হবে। জাকাতের হার হবে প্রতি ৩০টির জন্য একটি এক বছর বয়সের গরু এবং প্রতি ৪০টি বা তার অংশের জন্য দুই বছর বয়সের একটি গরু।

ছাগল-ভেড়া : ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৪০টি হলে একটি, ১২০টি পর্যন্ত দুটি, ৩০০টি পর্যন্ত তিনটি এবং এর ওপরে প্রতি ১০০টি ও তার অংশের জন্য আরো একটি করে ছাগল জাকাত দিতে হবে।

উট : উটের নিসাব পাঁচটি। প্রতি পাঁচটি উটে একটি করে ছাগল বা ভেড়া জাকাত দিতে হবে। কিন্তু উটের সংখ্যা ৪৪টি হলে একটি এক বছরের উষ্ট্রশাবক দিতে হবে। সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে এই হারে জাকাত দিতে হবে ।

ঘোড়া : ঘোড়া যদি যানবাহন, বোঝা বহন বা জিহাদের কাজে ব্যবহৃত হয় তাহলে জাকাত দিতে হবে না। কিন্তু তা না হলে ঘোড়ার মূল্য ৫২.৫০ তোলা রুপার মূল্যের সমান বা বেশি হলে, তার ওপর ২.৫০ শতাংশ হিসাবে জাকাত দিতে হবে ।

কোন কোন সম্পদে জাকাত নেই

যেসব সম্পদকে জাকাত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো :

জমি, মিল, ফ্যাক্টরি, ওয়্যারহাউস, গুদাম ইত্যাদি। দোকান, বাড়িঘর, জায়গাজমি, এক বছরের কম বয়সের গবাদি পশু। ব্যবহারের যাবতীয় কাপড়-চোপড়, বই-খাতা-কাগজ ও মুদ্রিত সামগ্রী, ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র, বাসন-কোসন ও সরঞ্জামাদি, তৈলচিত্র, স্ট্যাম্প। অফিসের যাবতীয় আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ইত্যাদি সরঞ্জাম। গৃহপালিত সব ধরনের মুরগি ও পাখি। কলকবজা, যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ইত্যাদি। চলাচলের জন্তু বা গাড়ি। যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম। ক্ষণস্থায়ী বা পচনশীল যাবতীয় কৃষিপণ্য। বপন করার জন্য সংরক্ষিত বীজ। জাকাত বছরের মধ্যে পেয়ে সে বছরের মধ্যেই ব্যয় করা হয়েছে এমন যাবতীয় সম্পদ। দাতব্য বা সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, যা জনগণের উপকার ও কল্যাণে নিয়োজিত। সরকারি মালিকানাভুক্ত নগদ অর্থ, সোনা-রুপা এবং অন্যান্য সম্পদ। তবে উল্লিখিত যেকোনো বস্তু ব্যবসার জন্য রাখা হয়েছে, তাতে জাকাত দিতে হবে।

জাকাত কাদের জন্য

কালামে পাকে আট শ্রেণির লোক জাকাত পাওয়ার যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে । (সুরা তওবা : ৬০)

ফকির, মিসকিন (যাদের আর্থিক অবস্থা গরিবদের চেয়েও খারাপ তারাই মিসকিন), জাকাতের কাজে নিযুক্ত লোক, নও-মুসলিমদের মন জয় করার জন্য, বন্দিদের মুক্ত করার জন্য, ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের জন্য, আল্লাহর পথে ব্যয়, মুসাফির।

জাকাত তহবিল থেকে দরিদ্র, অভাবী, দুস্থ নারী-পুরুষ, রুগ্ন, অক্ষম, পঙ্গু, বৃদ্ধ, এতিম, বিধবা এবং অনুরূপ অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করা যায়, যাতে তারা জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হন। দরিদ্র ও অভাবী জনগোষ্ঠীর সক্ষম অংশকে এমনভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে মানবিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে।

জাকাত কখন দেবেন

জাকাত চন্দ্র বছর অনুসারে দেওয়াই শ্রেয়। এর মধ্যে আবার রমজান মাস হচ্ছে উত্তম। অন্যান্য মাসে কোনো পুণ্যের কাজ করলে যে সওয়াব পাওয়া যায়, রমজান মাসে সে কাজ করলে আল্লাহ তার অনেকগুণ বেশি সওয়াব দিয়ে থাকেন। সে জন্য রমজান মাসে জাকাত দিলে অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। আমাদের দেশে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশেও অনেকেই রমজান মাসে জাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু সারা বছর জাকাত দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। মোট কথা পরিকল্পিতভাবে জাকাত সংগ্রহ ও ব্যয় বণ্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে যেকোনো দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও দুস্থ মানবতার কল্যাণে বিরাট ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে।

লেখক : এমডি ও সিইও, এক্সিম ব্যাংক

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.