হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারপ্রচ্ছদসাহিত্য

আলোর ঝলক হাশেমিয়া মাদরাসা

মুহাম্মদ শামসুল হক শারেক:::দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে যেন এক আলোর ঝলক ‘হাশেমিয়া কামিল মাদরাসা’। এখন থেকে অর্ধ শতাব্দীরও পূর্বে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এই আলোর ঝলক হাশেমিয়া মাদরাসা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অবহেলিত কক্সবাজারে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পেছেনে জমি দিয়ে মূখ্য ভূমিকা রেখেছেন মরহুম আলহাজ¦ কলিমুল্লাহ কন্ট্রাক্টর। বাল্যকালে তাঁর বাবা মৌলবী আবুল হাশেম ইন্তেকাল করায় তাঁর মাতা নূর বেগমের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর বাবার স্মরণে ‘হাশেমিয়া মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন কলিমুল্লাহ কন্ট্রাক্টর। ০১.০১.১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এই মাদরাসায় প্রাণ সঞ্চালন করে শক্ত হাতে এর হাল ধরে মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন মরহুম আল্লামা মুজহের আহমদ (রেক্টর হুজুর)। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এই মাদরাসা আজ উম্মুল মদারিস বা মাদরাসা সমূহের ‘মা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

জানাগেছে, মরহুম কলিমুল্লাহ কন্ট্রাক্টর মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর এর হাল ধরার জন্য একজন যোগ্য কারিগর খোঁজছিলেন। আল্লামা মুজহের আহমদ তখন চকরিয়া শাহরবিল আনোয়ারুল উলুম মাদরাসার সুপারের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর কাছে হাশেমিয়া মাদরাসার দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব করা হলে নাকি তিনি সময় চেয়ে ‘ইস্তেখারা’ করে আল্লাহর রেজামন্দী জানার সিদ্ধান্ত নেন। ইস্তেখারায় নাকি তিনি দেখতে পেলেন ‘তিনি হাতে একটি টর্স লাইট নিয়ে আলো জ¦ালিয়েছেন, আর সেই আলোতে গোটা দক্ষিণাঞ্চল আলোকিত হয়ে গেছে’। তখন তিনি হাশেমিয়া মাদরাসার দায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মতি জানান। সেই আলোর ঝলকই আজেকের দিনের ফুলে ফলে সুশোভিত ‘হাশেমিয়া কামিল মাস্টার্স মাদরাসা’। রেক্টর হুজুর দায়িত্ব নিয়ে নাকি একই সাথে ইয়াজ দাহুম বা ১ম শ্রেণী থেকে ফাজিল (বর্তমান ডিগ্রী মান) পর্যন্ত ক্লাশ শুরু করে নজির স্থাপন করেছিলেন। অনেক সীমবদ্ধতার সেই যুগে যা অকল্পনীয় বলেই মনে করা হতো। এটি, প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আলহাজ¦ কলিমুল্লাহ কন্ট্রাক্টর ও রেক্টর হুজুরের খুলুসিয়াত বা কারামতিই বলা চলে। এখন এই মাদরাসার হাল ধরেছেন মরহুম কলিমুল্লাহ কন্ট্রাক্টরের সুযোগ্য সন্তান মাওলানা আনোয়ার হাদি। তিনি মাদরাসার গর্ভানিং বডির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

গত ৫০ বছরে এই মাদরাসা থেকে লাখ লাখ আলেম তৈরী হয়েছেন। তৈরী হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। হাশেমিয়ার ছাত্ররা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ-ব্যারিষ্টার, শিক্ষাবিদ ও এমপি-উপজেলা চেয়ারম্যানের মত জনপ্রতিনিধি হয়ে সমাজ উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে এই মাদরাসা থেকে পড়া লেখা করা ছাত্ররা ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। মাদরাসা থেকে চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী ও কথিত জঙ্গি তৈরির কল্প কাহিনী সত্য নয়। ডাহা মিথ্যা এবং মাদরাসার শিক্ষার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও অপবাদ এটি।

গত ২৫ মার্চ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ ছিল হাশেমিয়া কামিল মাদরাসার প্রাক্তন ছাত্রদের মিলন মেলা। প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রাক্তন ছাত্রদের এই পূনর্মিলনী সমাবেশের অয়োজন করে আসছে। এবার মাদরাসা মাঠে পেন্ডেল করে মিলন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আমার একমাত্র পুত্র সন্তান মুহাম্মদ নাঈম শারেক’কে সাথে নিয়ে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিই। আমি ওখান থেকে কামিল পাশ করলেও সে দু‘বছর আগে দাখিল পাশ করে এবারে কক্সবাজার কলেজ থেকে ইন্টার পরীক্ষার্থী। অর্ভ্যতনা কাউন্টারে গিয়ে বাপ-বেটা দুজনেই এক সাথে প্রয়োজনীয় কার্ড সংগ্রহ করি। দু’জনেরই প্রিয় প্রতিষ্ঠান হাশেমিয়া মাদরাসার প্রাক্তন ছাত্র মিলন মেলায় একসাথে যোগ দান বেশ ভাল লেগেছে।

বিকেল ৩টা থেকে সমাবেশ শুরু হলেও বাদ আসর থেকে ছিল শুভেচ্ছা বক্তব্যের পালা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মাদরাসার বর্তমান প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা মুহিবুল্লাহ, মাদরাসার অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা অব্দুল গফুর, মাদরাসার প্রধান মুহাদ্দিস মাওলানা আতাউল্লাহ মুহাম্মদ নোমান, প্রভাষক মাওলানা আবু সাঈদ। এসময় বক্তব্য রাখেন এই মাদরাসার প্রথম শিক্ষক মাওলানা আব্দুস সামাদ। আল্লাহ মেহেরবানীতে ১০৫ বছর বয়সে তিনি এখনো হাাঁট চলা করতে এবং ষ্পষ্ট বক্তব্য রাখতে সক্ষম। বক্তব্য রাখেন মাদরাসার প্রথম ছাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন চৌধুরী। প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন, সিতাকু- আলীয়া মাস্টার্স মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল কক্সবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতীব মাওলানা মাহমুদুল হক, আদর্শ মহিলা কামিল মাস্টার্স মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা ফরিদ আহমদ চৌধুরী, আমি (সাংবাদিক শামসুল হক শারেক), চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলীয়া মাস্টাস মাদরাসার ইংরেজী প্রভাষক শাহ নেওয়াজ, ব্যারিষ্টার আবুল আলা, এড. নেজামুল হক, কক্সবাজার সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শহীদুল আলম বাহাদুর, মাদরাসার সাবেক ভিপি মুহাম্মদ ইদ্রিস, সাবেক জিএস প্রফেসার শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ সাংবাদিক রুহুল আমিন সিকদার প্রমূখ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা তৎকালীন জয়বাংলা বাহিনী কক্সবাজারের প্রধান কামাল হোসেন চৌধুরী বলেন, এই মাদরাসায় পড়েই তো আমি জালিমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা পেয়েছি। পাকিস্তানীদের জুলম নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর যেখানে একজন মুসুলমান আছে সেখানে ইসলাম থাকবে। সেখানে জুলম নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিহাদ হবে, মুসলমানরা শহীদ হবে, গাজী হবে। মুক্তিযুদ্ধ ইসলামের শিক্ষা। মুসলমানরাই তো সারা দুনিয়াকে শিখিয়েছে, সভ্যতা-সংস্কৃতি, দেশ পরিচালনা ও যুদ্ধ নীতি। তিনি বলেন, জিহাদ মানে তথাকথিত জঙ্গিবাদ নয়। মাদরাসা থেকে জঙ্গি তৈরী হয়না। দেশ ও ধর্মের জন্য মুজাহিদ তৈরী হয়। এসময় কান্নায় তাঁর কণ্ঠ ধরে যায়, দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে।

তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম আছে এবং থাকবে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মাননীয় নেত্রী আপনার আশপাশে কিছু দিকভ্রান্ত লোক আছে। ওরা অপনাকে বিভ্রান্ত করছে। আমি আপনাকে যতটুকু জানি ওদের কথা আপনি শুনবেন না। দেশে সকল ধর্মের মানুষ আছে। তারা নিজ নিজ ধর্ম পালনে স্বাধীন। সংবিধানে দেশের ৯২ভাগ মানুষের ধর্ম ‘রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম’ বহাল রাখুন। সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বাতিল করা হলে কক্সবাজার থেকে তিনিই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলবেন বলে ঘোষণা দেন। সুন্দর পেন্ডেলের ষ্টেজ থেকে যখন কামাল চৌধুরী এই বক্তব্য রাখছিলেন তখন উপস্থিত সবাই তাঁকে সমর্থন জানিয়ে শ্লোগান দেয়।

অনুষ্ঠানে মাদরাসার প্রথম শিক্ষক ১০৫ বছর বয়সী মাওলানা অব্দুস সামাদ, প্রথম ছাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন চৌধুরী, সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল গফুর ও প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা মাহমুদুল হক’কে সম্মাননা ক্রেষ্ট ও মাদরাসার শিক্ষক মরহুম মাওলানা মালেকুজ্জামানকে মরনোত্তর ক্রেষ্ট প্রদান করা হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ’র সভাপতি মাওলানা নজরুল ইসলাম। সুন্দর সাবলীল উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি পরিচালন করেন, মাদরাসার প্রাক্তন ছাত্র ইসলামিয়া মহিলা কামিল মাস্টার্স মাদরাসার বাংলা প্রভাষক ফরিদুল আলম। তাঁকে সহযোগিতা করেন হাশেমিয়া মাদরাসার বাংলা প্রভাষক সৈয়দ নূর, প্রাক্তন ছাত্র সাংবাদিক হুমায়ুন সিকদার, মাওলানা আব্দুল গফুর ও মুজহের আহমদ প্রমূখ। মিলন মেলাকে ঘিরে ‘ঐতিহ্য’ নামের সমৃদ্ধ একটি বুলেটিন প্রকাশ করা হয়। মাদরাসার প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমান ওই মাদরাসার সভাপতি মাওলানা আনোয়ার হাদি এবং ভাইস প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা আজিজুল হক অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকায় বেশ দৃষ্টি কটু লেগেছে। সমাবেশে প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপ্যাল মরহুম আল্লামা মুজহের আহম (রেক্টর হুজুর), সাবেক প্রিন্সিপ্যাল মরহুম মাওলানা মুজাফ্ফর আহমদ, সাবেক প্রিন্সিপ্যাল মালানা সিরাজুল হক, শিক্ষক মাওলানা মরহুম মালেকুজ্জামান ও মাওলানা আহমদ কবিরসহ সকলের মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়। সব শেষে অনির্বাণ শিল্পি গোষ্ঠীর পরিচালনায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

উল্লেখ্য বর্তমান সরকার মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে ইসলামী আরবী বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে দেশের আলেম ওলামাদের শত বছরের দাবী পূরণ করেছেন। ৩১ টি মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বহুদূর এগিয়ে দিয়েছেন। মাদরাসা শিক্ষকদের জীবন মান উন্নয়নে কয়েক গুণ বেতন বৃদ্ধি করেছেন। অবশ্যই বলতে হবে এগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আর এর পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ জমিয়াতুল মুদার্রেছীন। সম্প্রতি কক্সবাজার-রামুর এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল হাশেমিয়া মাদরসার বার্ষিক সভায় যোগদান করে মাদরাসার বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণে দশ লাখ টাকা অনুদানের ঘোষণা দিয়েছেন। এজন্য প্রাক্তন ছাত্রদের ওই সমাবেশ থেকে সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলকে জানানো হয়েছে অশেষ অশেষ সাধুবাদ। হাশেমিয়া মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালুর বিষয়টি বিবেচনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সু-নজর কামনা করা হয় মিলন মেলা থেকে। ২৬.০৩.২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ।

# লেখক ঃ কক্সবাজার ব্যুরো চীফ দৈনিক ইনকিলাব, প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক দৈনিক হিমছড়ি ও পরিচালক আল কুরআন সোসাইট কক্সবাজার। মোবাইল ঃ ০১৮১৯-১৭০১৯০। ঊ-গধরষ : রহয়রষধন.পড়ী@মসধরষ.পড়স

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.