হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসাহিত্য

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে

1939683_223558094504791_1118102641_nমোবায়েদুর রহমান :

……..শুধুমাত্র আমরা, অর্থাৎ ইনকিলাবের কলামিস্টরাই নই, বিভিন্ন পত্রিকার কলামিস্টরা বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত লিখে যাচ্ছি অনেক ভালো ভালো কথা। রবীন্দ্রনাথের একটি চমৎকার গান আছে। গানটির দুটি লাইন হলো, ‘সব কথা শেষে মিলে গেলো এসে/তোমার ও দুটি নয়নে’। তেমনি আমরাও যত কথাই লিখে যাই না কেন, সব কথা শেষে, মিলে যায় এসে, ক্ষমতার ওই দুটি চরণে। সব কথার শেষ কথা হলো ইলেকশন।
বাংলাদেশের জন্মের পর অনেকগুলো ইলেকশন হলো। এই পর্যন্ত ১০টি জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেছে এবং ৯টি পার্লামেন্ট গুজরে গেছে। এখন ১০ম পার্লামেন্ট চলছে। অর্থাৎ কত মন্ত্রিসভা এলো, আর কত মন্ত্রিসভা গেলো। ‘আমরা তথা জনগণ যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছি।’ এই জীবনে বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রিসভা দেখলাম। প্রথমে তাজউদ্দীন, পরে শেখ মুজিব, তারপর শাহ আজিজুর রহমান, তারপর মরহুম আতাউর রহমান খান, কাজী জাফর আহমেদ। এরপর ঘুরে ফিরে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া। কিন্তু আওয়াম জনতা বলতে আমরা যেটা বুঝি তাদের অবস্থার কি কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে? এখানে বলা দরকার যে, আমাদের দেশের পত্রপত্রিকাসমূহে প্রায়শই লেখা হয় ‘আমজনতা’। প্রথম প্রথম এই ‘আম’ শব্দটি পড়ে আমি খুব বিভ্রান্ত হতাম। আম তো একটি ফল। তার সাথে জনতা শব্দটি জুড়ে দিয়ে কি বুঝানো হয়? আম্র ফলের মতো জনতা? সেটা আবার কেমন? তাহলে তো জাম, কাঁঠাল, লিচু ফলের মতোও জনতা হতে পারে।
যখন এই রকম বিভ্রান্তিতে ভুগছি, তখন একজন এসে আমার ভুল ভাঙালেন। বললেন, ‘আম জনতা নয়। ওইটা হবে আওয়াম জনতা।’ অর্থাৎ সাধারণ মানুষ। এই আওয়াম শব্দ থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দলের নাম দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের লীগ বা সম্মিলন। যাই হোক, যে কথা বলছিলাম। আমরা সাধারণ মানুষ যে জায়গাতে ছিলাম সেই জায়গাতেই রয়ে গেছি। আমি একজন সাংবাদিক। আমার যেখানে যাওয়ার সেখানেই গেছি। আঞ্জুমান আরা বেগম বা সাবিনা ইয়াসমিন- ওরা হলেন কণ্ঠশিল্পী। ওদের পক্ষেও কালের আবর্তনে যেখানে যাওয়ার কথা সেখানেই গেছেন। অবস্থার গুণগত পরিবর্তন এতটুকু ঘটেছে যে এখন নীরবে পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। বয়সের সাথে সাথে চাকরির সিনিয়রিটি বাড়ে, প্রমোশনও হয়। এটি যে কোন সরকারের আমলেই হতো, ভবিষ্যতেও হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বলা হয় যে, ৪০ বছরে দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। এই এগিয়ে যাওয়াটা কোন দেশে হয়নি বা ঘটেনি? বড় লোকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বলা হয় যে, এখন বাংলাদেশের ১ কোটি টাকা আছে, এই রকম লোকের সংখ্যা নাকি ৩৪ হাজার। এই তথ্যকে আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না। তবে এটাও তো ঠিক যে, ৭১ সালের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। সুতরাং ৩৪ হাজারের বিপরীতে মাসে ১০,০০০ টাকা আয়ের লোকের সংখ্যা কয়েক কোটি। প্রিয় পাঠক, এইসব হিসাব-নিকাশ করার আগে দেখতে হবে যে, কোটিপতির সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি ৭১ সালের ১০ হাজার রিকশাওয়ালার সংখ্যা আজ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ। কাজেই পুঁজিবাদী অর্থনীতির মাপকাঠিগুলো এনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে আওয়াম জনতার অবস্থার উন্নতি বা অবনতি বিবেচনা করা যাবে না। আসলে আমরা গণমুখী রাজনীতির কথা অনেক বলি। কিন্তু আমাদের পলিটিশিয়ানরা গণমুখী রাজনীতি করেন না। তারা গণমুখী রাজনীতি করবেন কিভাবে? তারা নিজেরাই তো গণমুখী নন। এখন অবশ্য গণমুখী শব্দটা ধীরে ধীরে পিছনে চলে যাচ্ছে। সেখানে স্থান করে নিচ্ছে আরেকটি নতুন শব্দ। সেটি হলো দরিদ্রবান্ধব। অর্থাৎ যারা গরিবের বন্ধু।
দুই
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তার কলামে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পলিটিশিয়ানকে বিভিন্ন টাইটেল বা খেতাব দিয়েছেন। অধুনালুপ্ত ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভারের প্রতিষ্ঠাতা এবং মালিক ছিলেন মরহুম হামিদুল হক চৌধুরি। তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। জনাব চৌধুরি একজন ডাকসাঁইটে আইনজীবী ছিলেন। গ্রীন রোড দিয়ে পুব দিকে ঢুকে গেলে কয়েক গজ পরেই হামিদুল হক চৌধুরির প্রাসাদতুল্য বাড়ি। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। তবে গরিব মানুষদের সাথে তার কোন সংশ্রব ছিলো না। মরহুম মানিক মিয়া জনাব চৌধুরিকে ঠাট্টা করে বলতেন, ‘গরিবের বন্ধু’। হামিদুল হক চৌধুরির নামকে ঠাট্টা করে (নাকি বিকৃত করে) বলতেন হরিবল হক চৌধুরি। এখন বাংলাদেশে অনেক হরিবল হক চৌধুরির দেখা পাওয়া যায়। টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভিতে এখন সংবাদের মাঝে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে একটি ধারাবাহিক। ধারাবাহিকটির নাম, ‘দুদকের কাঠগড়ায় পলিটিশিয়ানরা’। প্রতিদিনই একজন একজন করে ধনী লোককে ওই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট এবং দুদকের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী থেকে দেখা যাচ্ছে যে, কাঠগড়ায় অভিযুক্ত এসব ব্যক্তি বিগত পাঁচ বছরে তাদের সম্পদ তিন গুণ থেকে ১শ’ বা দেড়শ’ গুণ বাড়িয়েছেন। যাদের ছিলো কয়েক লাখ টাকা তারা এই পাঁচ বছরে কোটি টাকা বানিয়েছেন। যাদের ছিলো কোটি টাকা তারা সেটিকে বাড়িয়ে শত কোটি বা হাজার কোটি টাকা বানিয়েছেন। তারপরও তারা জনগণের সেবক, গরিবের বন্ধু। হামিদুল হক চৌধুরির এরা সব ভায়রা ভাই। হামিদুল হক চৌধুরির বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো না। সেই পাকিস্তান আমলেও তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা কামাই করতেন। তিনি টাকা কামাই করে বড়লোক হয়েছেন। তার জীবিত কালে একাধিকবার তার সাথে দেখা হওয়ার এবং কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। তার সাথে রাজনৈতিক বিষয়ে আমার মতৈক্য ছিলো না। তার পত্রিকা অবজারভার পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের মুখর প্রবক্তা ছিলো। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে হক চৌধুরি সাহেব স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে পার্লামেন্টে বা মন্ত্রিসভায় মুখর প্রবক্তা ছিলেন না। তবে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেন। এখন যারা শত কোটি বা হাজার কোটি টাকা বানাচ্ছেন তারা সব আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছেন। চোর করে সিঁধেল চুরি। এরা করছেন পুকুর চুরি।
তিন
এদের পাশে আমি কয়েকটি রাজনৈতিক চরিত্র তুলে ধরছি। দেখুন, তারা কত নির্লোভ, সৎ এবং ত্যাগী। কয়েকদিন আগে একটি বাংলা ট্যাবলয়েডে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিলো সংবাদটি নিচে তুলে ধরলাম।
সমাজতন্ত্র বা শ্রেণীহীন সমাজে বিশ্বাসী তারা। রাজনীতিতে এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে দল পরিচালনা করেন। দলের জন্য নিজেদের ব্যক্তিজীবনও বিসর্জন দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ঘর-সংসারের পরিবর্তে তারা গড়েছেন ‘পার্টি হাউজ’। কাটান ব্যাচেলর জীবন। প্রাত্যহিক সব কাজকর্ম করেন নিজ হাতে। তাদের কারও বয়স ৫০, কারও বা আরও বেশি। বিয়ে করেননি কেউ। সংসার গড়ার চিন্তাও নেই। নেই ব্যক্তিগত কোন সম্পদও। এই ব্যাচেলর সদস্যরা হলেন বাংলাদেশের একটি সমাজতান্ত্রিক দলের। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত দলটি সূচনা থেকে সমাজতন্ত্রের প্রকৃত নীতি মেনে পরিচালিত হচ্ছে। আর এ নীতির অংশ হিসেবেই ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আলাদা থাকছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। বর্তমানে চার সদস্যের কমিটির মাধ্যমে দলটির পরিচালিত হচ্ছে। এ চার নেতাই থাকেন দলীয় কার্যালয় ও পার্টি হাউজে। তবে অনেকের জানা নেই তাদের চিরকুমার থাকার পেছনের কারণ। নেতাদের দাবি সংসার জীবন চালাতে হলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকা প্রয়োজন।
দলের টাকা দিয়ে তারা তোপখানার সেগুন বাগিচায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়া এই ফ্ল্যাটে কেউ থাকেন না। বাসায় নেই কোন গৃহপরিচারিকা। বিশেষ প্রয়োজনে নেতৃবৃন্দকে সহযোগিতা করেন দলের কর্মীরা। রান্নাবান্নার জন্য কেনাকাটা করেন দলের লোকজনই। নিজ হাতেই রান্নাবান্না করেন নেতারা। মাংস, ভর্তা ও শুঁটকিসহ সব পদের রান্নার কৌশলই রপ্ত করেছেন তারা। ভালো কিছু রান্না হলে দলের অন্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। তাদের মতে, সংগ্রামী জীবনে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে রয়েছে তাদের দৃঢ় বন্ধন। তা ভ্রাতৃত্বের ও বন্ধুত্বের। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক থাকেন দলের অফিসে। তার আবাসনের জন্য অফিসে রয়েছে আলাদা কক্ষ। ওই কক্ষের সঙ্গে আছে রান্নার কক্ষ। আছে বুক সেলফ। এতে আছে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বই। একটি খাট। একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার। আসবাবপত্র। ঢাকায় থাকলে তিনি এখানেই থাকেন। গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন দলের কাজে। দলের অফিসে নেতাকর্মীরাই বারবার চা তৈরি করে দেন তাকে। অনেক সময় নিজেই রান্নার কাজ করেন তবে তার অন্য ব্যস্ততা থাকলে সহযোগিতা করেন দলের লোকজন। নেতাকর্মীরা জানান, নিজের কাজ নিজে করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। ঢাকার বাইরে গেলে থাকেন দলীয় অফিস বা দলের নেতাদের বাসায়। দলের নিয়মানুসারে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি লিখে দেন দলের নামে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হলেও এখন নিজের কোন সম্পদ নেই। এমনকি বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতে অংশগ্রহণ করে উপার্জিত আয়ও দলের ফান্ডে জমা দেন তিনি। অন্যদিকে তার নিজের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সকল ব্যয় নির্বাহ করে দল।
আরেকজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য যৌবন পেরিয়েছেন। নিজের সংসারের প্রয়োজন অনুভব করেন না পুরো দেশটাই তার সংসার। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোই তার আপন স্বজন। তার জন্ম ঢাকার ধামরাই এলাকায়। সকল সম্পদ দলের নামে লিখে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার পর। তার এবং তার মায়ের যাবতীয় খরচ চলে এখন দলের অর্থে। এটি শুধু দল নয় একটি পরিবার- বলে দাবি করেন। কর্মব্যস্ততার কারণেই বিয়ে করেননি বলে জানান দলটির এই কেন্দ্রীয় সদস্য। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে অনেকেই বিয়ে করেননি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ওসমানীও বিয়ে করেননি। এছাড়া, অনেক কারণেই বিয়ে করা হয় না। অনেক গরিব মানুষও বিয়ে করেন না।
কেন্দ্রীয় কমিটির আরেকজন সদস্য। তিনি আইনজীবী হলেও দলের প্রয়োজন ছাড়া আদালতে যাননি কখনও। দলের প্রয়োজনে দিয়ে যাচ্ছেন শ্রম, সময়। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার পরই নিজের সম্পদ দিয়েছেন দলকে। সংগ্রামী জীবনে বউ-সংসার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন তিনি। ‘পার্টি হাউজ’-ই তার নিবাস। বিয়ে সংসার সম্পর্কে রাজনৈতিক অসঙ্গতি যাতে সৃষ্টি না হয় এজন্যই সংসার করা হয়নি। এছাড়া সে রকম কেউ হয়তো আমাদের সামনে আসেনি। তবে ভবিষ্যতে নেতৃবৃন্দ সংসার করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের স্ত্রীরাও দলের জন্য কাজ করবেন।’ সম্পত্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পদ থাকার নিয়ম নেই।’
একইভাবে দিনাতিপাত করেন দলের অপর একজন কেন্দ্রীয় সদস্য। বাবা-মা আছেন। আছেন তিন ভাই ও চার বোন। তারা সবাই সংসার জীবন কাটাচ্ছেন। তবে তিনি এখনও ব্যাচেলর। দলকে নিয়ে এবং দেশের মানুষকে নিয়েই তার সব স্বপ্ন। জন্ম রংপুর সদরে। লেখাপড়া করেছেন রংপুরে। পরে ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এ নেতা বলেন, সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা রাজনীতি করি। আমরা মনে করি যতদিন শোষণমুক্ত সমাজ হবে না ততদিন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে না। ব্যক্তিগত সম্পতির বদলে সামাজিক সম্পত্তির ধারণায় আমরা বিশ্বাস করি তাই ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেতাদের নেই। সংসার জীবনের ক্ষেত্রে দলীয় কোন বাধা-নিষেধ না থাকলেও নেতারা স্বেচ্ছায়ই সংসার জীবন থেকে দূরে থাকেন। এটি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
চার
পশ্চিমবঙ্গের দুই মুখ্যমন্ত্রীর কথা বলছি। একজন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আরেকজন হলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য। তাদের রাজনীতি, রাজনৈতিক মতবাদ এবং রাজ্যশাসন সম্পর্কে আমি কোন কথা বলছি না। তাদের চরিত্র এবং জীবনযাত্রার একটি বিশেষ দিক এখানে তুলে ধরছি। মমতা ব্যানার্জি কলকাতা থেকে ইতিহাসে অনার্স, ইসলামের ইতিহাসে এমএ, ডিগ্রি এবং আইন শাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি আছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে দুইবার রেলমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। গত তিন বছর ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ব্যক্তিগতভাবে তার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত দুর্নীতির কোন অভিযোগ নেই। অত্যন্ত সাধাসিধা এবং অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। সব সময় সুতি শাড়ি পরেন। ব্যক্তিগত জীবনে এখন পর্যন্ত তিনি বিয়ে করেননি। কয়েক বছর আগে যখন তিনি ঢাকায় এসেছিলেন তখন রিকশা করে ঢাকার রাজপথে ঘুরেছেন। তিনি একজন চিত্রকর এবং কবি।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য পশ্চিমবঙ্গের একজন নামজাদা সাহিত্যিক। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরোর সদস্য। পশ্চিমবঙ্গের কিংবদন্তি নেতা জ্যোতি বসু মারা গেলে বুদ্ধদেব মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ১০ বছর ওই পদে বহাল থাকেন। তার বিরুদ্ধে কোন দিন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। আর ওঠার কথাও নয়। কারণ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য কমিউনিস্ট পার্টির টাকায় চলতেন। যখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনও দল থেকে তাকে মাসিক ১২ হাজার রুপি খরচ দেয়া হতো। এই টাকাতেই তিনি চলতেন।
আরেকজন নেতার কথা উল্লেখ করে আজকের লেখা শেষ করছি। তিনি হলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। ইরানের মতো একটি বিশাল এবং তেলসমৃদ্ধ দেশের প্রসিডেন্ট হওয়ার পরেও তিনি প্রেসিডেন্টের সরকারি প্রাসাদে থাকেননি। তার বাড়িতে একটি কার্পেটও ছিলো না। তিন রুমের একটি ছোট্ট বাসায় তিনি থাকতেন। প্রেসিডেন্টের যে বেতন সে বেতন তিনি গ্রহণ করতেন না।
আরো দুই ব্যক্তির নাম বলছি। একজন হলেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। আরেকজন হলেন দুনিয়া কাঁপানো ওসামা বিন লাদেন। বিন লাদেন সৌদি আরবের এক ধনাঢ্য পরিবারের সদস্য ছিলেন। নিজের দেশ থেকে তিনি নিজস্ব ব্যবসার হাজার হাজার কোটি টাকা আনতেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেগুলো ব্যয় করতেন। তার সাথীদের সাথে তিনি মাটিতে বসে একসাথে আহার করতেন। অটল বিহারী বাজপেয়ী ছিলেন চিরকুমার।
ওপরে যাদের কথা বলা হলো তারা সবাই ছিলেন নির্লোভ, নিরহঙ্কার। দুর্নীতির ঊর্ধ্বে ছিলেন তারা। কারণ তাদের জাগতিক কোন টান ছিলো না। আমাদের দেশে কি আমরা এই ধরনের একজন নেতার কথাও বলতে পারবো? পারবো না। কারণ আমাদেরকে দ্রুত বড়লোক হতে হবে। এই দেশ নিয়ে যখন ভাবি তখন মনে হয় কবিতার ওই দুটি লাইন,
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে॥’ –