হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদফিচার

মানুষ বিক্রির ‘লাভজনক’ ব্যবসা!

আব্দুল কুদ্দুস রানা :
এ মুহুর্তে ‘লাভজনক’ ব্যবসা কোনটি? উত্তরে অনেকে বলতে পারেন, জমি-জমার ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরা ব্যবসা, শুটকির ব্যrana-240x300বসা-ইত্যাদি।
আসলে কি তাই ? আমার মনে হয় বিশাল একটি জনগোষ্টি ওই মতের সাথে একমত হবেন না। তাঁরা এক কথায় বলে দেবেন, এখন লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে ‘মানুষ বিক্রি’। এই ব্যবসায় সরকারকে দিতে হয়না কোন টেক্স কিংবা কর। এই ব্যবসায় অর্জিত সম্পদের হিসাবও দিতে হয়না কাউকে। শহর কিংবা গ্রাম যেখানেই হোক, ইয়াবা আর মানব পাচারের কালো টাকা থাকলে জমি কিনে সেখানে তৈরি করতে পারে-আকাশ ছোঁয়া ‘রাজমহল’। ব্যবসা লাভজনক বলেই আজ কক্সবাজার উপকুল বিশ্বব্যাপী আলোচিত জায়গা। কক্সবাজার উপকুলকে বলা হচ্ছে মানব পাচারের নিরাপদ ঘাট।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ মানব পাচার ইস্যুতে ‘কক্সবাজার’ উপকুল সারাবিশ্বে আলোচনার শীর্ষে। কারণ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়া-যেখানেই অভিবাসীরা ধরা পড়–ক, তাঁদের যাত্রাস্থল হিসাবে ঘুরে ফিরে আসছে কক্সবাজারের নাম। এক সময়ের ‘স্বাস্থ্যকর স্থান’ আর বর্তমানের ‘ পর্যটন রাজধানী’ তমকা হারিয়ে ‘কক্সবাজার’ এখন ‘ইয়াবা’ আর ‘মানবপাচার’ এর আখড়ায় পরিনত হয়েছে। এই ময়লা সরিয়ে ফেলার গরজ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে যেমন নেই, নেই অন্য কোথাও। যে যেভাবে পারি-সুবিধা দিয়ে কিংবা নিয়ে আমরা দিনদিন বড় মানুষ হচ্ছি। কক্সবাজারের  বদনাম হলে আমার কি ?
সেদিন একজন রিকশা চালক কৌতুহল বশে জানতে চাইলেন, থাইল্যান্ড সরকার মানব পাচারের দায়ে সেদেশের একজন সেনা কর্তকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তার সম্পদও বাজেয়াপ্ত করেছে। তো বাংলাদেশে কি এরকম আদেশ দেওয়া যায়না ? মানব পাচারকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা গেলে ‘মানুষ বিক্রির’ এই ব্যবসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যেত।
মানব পাচার বন্ধ করতে কী করা দরকার-সেটা অশিক্ষিত রিকশাওয়ালার মাথায় ঢোকলেও আমরা যারা শিক্ষিত কিংবা সচেতন মানুষ দাবী করি-তাঁদের মনে ধরেনা।  থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশে কোনো ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, সেনা কিংবা পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্পদ বাজেয়াপ্ত কিংবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওই ঘোষণা জারী করা সম্ভব ? এধরণের ঘোষণা দেওয়ার মত আইন দেশে আছে কি না-অনেকের জানা নেই। তাইতো বেপরোয়া পাচারকারীরা।
২০১২ সালে বাংলাদেশ প্রণয়ন করে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন। তবে এখনও তৈরি হয়নি বিধিমালা। ফলে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছেনা আইনটি। এখন বিধিমালা প্রনয়নের পাশাপাশি দ্রুত ট্রাইব্যুনাল গঠন দরকার। আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল না থাকায় মামলা নিস্পতিতে দেরি হচ্ছে। যার পুরোটা সুবিধা নিচ্ছে অপরাধীরা। মানব পাচার মামলায় আটক হলেও আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। আবার জড়িয়ে পড়ছে মানব পাচারে।
দেশে মানব পাচার আইনে গত সাড়ে তিন বছরে মামলা হয়েছে দেড় হাজারের বেশি। এসব মামলায় আসামী ছয় হাজারের বেশি। সমঝোতার ভিত্তিতে নিস্পতি হয়েছে মাত্র আটটি মামলা। তবে কারও শাস্তি হয়নি। মানব পাচার আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা। কিন্তু একটি মামলার ক্ষেত্রেও সেটি হয়নি। এই আইনে অপরাধ অজামিনযোগ্য হলেও আসামীরা জামিন পেয়ে আবার মানব পাচারে জড়িয়ে পড়ছে।
২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর এবছরের ৩০ মে পর্যন্ত কক্সবাজারে মামলা হয়েছে ৩২৪টি। কিন্তু একটি মামলারও বিচারকাজ শেষ হয়নি। ফলে
মানব পাচারের অভিযোগে যাদের আটক করা হয়, তারাই আবার মানব পাচারে জড়িয়ে পড়েছে।
যেমন উখিয়ার আলোচিত ‘রেভি ম্যাডাম’। এই ম্যাডাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে দুইবার ধরা পড়েন।  কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় শুরু করেন মানুষ বিক্রির সেই লাভজনক ব্যবসা। তাঁর স্বামীও জড়িত এই ব্যবসায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের ২৪১ জনের মানব পাচারকারীর তালিকায় রেভি ম্যাডামের নাম ১৬৪ নম্বরে আর তাঁর স্বামী নুরুল কবিরের নাম ১৬২ নম্বরে। কিন্তু তাঁরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশের তথ্য মতে এই আলোচিত ‘স্বামী-স্ত্রী’র বিরুদ্ধে থানায় মানব পাচারের মামলা আছে ১১টি। মানুষ বিক্রির ব্যবসা করে অর্জন করা রেভি ম্যাডামের বিপুল সম্পদ বাজেয়াপ্ত কিংবা সম্পদ জব্দ করার ঘোষণা কে দেবেন ? কারণ রেডি ম্যাডামের ডানে-বামে থাকেন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিরা।
গত ৩ জুন মানবপাচারে জড়িত থাই সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট জেনারেল মানাস কংপানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারী করা হয়। এরপর ১০ কোটি ৯০ লাখ বাথ ( বাংলাদেশি ২৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা) সমমুল্যের সম্পদ জব্দ করে দেশটির অর্থপাচার বিভাগ ( আমলো)। জব্দ তালিকায় ৬৮ ধরণের সম্পদ ও ৪০ লাখ বাথের ব্যাংক এ্যাকাউন্ট রয়েছে। মানাস সরাসরি মানব পাচারে জড়িত ছিলেন। সম্প্রতি আন্দামান ও বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানবপাচার এবং লোকজনকে (অভিবাসীদের) আটকে রেখে নির্যাতনের খবর প্রকাশ পেলে থাইল্যান্ড সরকার মানব পাচারের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। এর আগে মানব পাচারে জড়িত থাকার দায়ে সেদেশের মেয়র, পুলিশের সদস্যসহ বিপুল সংখ্যক মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারীর পর সেনা কর্মকর্তা মানাসও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
কিন্তু বাংলাদেশ কিংবা কক্সবাজারের ক্ষেত্রে কি এসব কল্পনা করা যায় ?
মালয়েশিয়াতে আরও শতাধিক গণকবরের সন্ধান পেয়েছে সেখানকার পুলিশ। গণকবর গুলি ছিল পাচার হওয়া মানুষের। মুত্যুর আগে অভিবাসীদের আটকে রাখা হতো খাঁচাবন্দি করে, যার শেষ পরিনাম মৃত্যু। মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড সীমান্তের কেদাং, পেরাক ও কেলানতানে এরকম ট্রানজিট ক্যাম্প ও গণকবর সন্ধান পাওয়া গেছে ১২ জুন। মালয়েশিয়ার বহুল প্রচারিত দৈনিক সান এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বুকিত গেন্টিং পেরাহ ও বুকিতওয়াং বার্মায় ২৮টি ক্যাম্পে এধরণের ১৩৯টি কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। যা পাঁচ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে। পাচার হওয়া মানুষ মিয়ানমার ও বাংলাদেশের।
আইওএমের মুখপাত্র আসিফ মুনীর বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধার ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার এপর্যন্ত ২৪৭ জনকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাঁদের মধ্য থেকে গত ১২ জুন ১৮ জনকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড উদ্ধার হওয়া এক হাজারের বেশি অভিবাসীর তালিকায় কতজন বাংলাদেশি- তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। মিয়ানমারেও উদ্ধার হয়েছে হাজারো অভিবাসী। এরমধ্যে গত ৮ জুন ১৫০ জন অভিবাসীকে বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনা হয়।
এই অভিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমবেশি সবাই কক্সবাজার উপকুল দিয়ে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল। কিন্তু দালালদের লক্ষ্য ছিল থাইল্যান্ড জঙ্গলে নিয়ে আটকিয়ে মুক্তিপন আদায় করা। গত ৬ মে থাইল্যান্ড জঙ্গলে একাধিক গণকবর এবং সেখানে বাংলাদেশিসহ অনেকের মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় চলে। এরপর দালালেরা থাইল্যান্ড জঙ্গল থেকে ক্যাম্প সরিয়ে সাগরে ভাসমান ট্রলার বা জাহাজকেই মুক্তিপন আদায়ের পথ হিসাবে বেছে নেয়। যা এখনও অব্যাহত আছে।
কয়েকদিন আগে ঢাকার একটি মানবাধীকার সংগঠনের কর্মীর প্রশ্ন ছিল- ‘থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার জঙ্গলে একাধিক গণকবর ও বন্দিশিবির আবিস্কার হয়েছে। কিন্তু মানব পাচারের নিরাপদ ঘাঁটি কক্সবাজারে কি গণকবর নেই ? নেই কোন বন্দি শিবির ? তাহলে কি লাখ লাখ মানুষ স্বউদ্যোগে ট্রলারে ওঠে গেল ? তাহলে আইনশৃংখলা বাহিনী মানব পাচারের দায়ে এতগুলো মামলা করলো কেন ? সেই মামলায় আসামী হলো কারা ? আর জোর পুর্বক মানব পাচার হয়ে থাকলে লোকজনকে আটকিয়ে রাখার আখড়াতো থাকবেই। সাংবাদিকেরা সেই আখড়া খুঁজে পায়না কেন ?
‘মানব পাচার’ অর্থ সম্পর্কে আইনে বলা আছে-‘কোন  ব্যক্তিকে ভয়ভীতি প্রদর্শণ করিয়া বা বলপ্রয়োগ করিয়া, বা প্রতারণা করিয়া অথবা উক্ত ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক বা পরিবেশগত বা অন্য কোন অসহায়ত্বকে কাজে লাগাইয়া বা অর্থ অথবা অন্য কোন সুবিধা লেনদেন পুর্বক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে যৌন শোষণ বা নিপীড়ন বা শ্রম শোষণ বা অন্যকোন শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশ্যে বিক্রয় বা ক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকাইয়া রাখা বা চাকুরির উদ্দেশে গমন, অভিবাসন বা বহির্গমন করিতে প্রলুব্দ বা সহায়তা করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি ‘মানব পাচার’ এর অর্ন্তভুক্ত হইবে।’
কিন্তু আমরা এরকম ঘটনা অহরহ দেখছি। কিন্তু মানব পাচারকারীদের সহায়তার দায়ে গডফাদারদের বিরুদ্ধে মামলা হয়না।
এই আইনে অপরাধ প্রমানিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা অন্যুন সাত বছরের সশ্রম করাদন্ড এবং অন্যুন পাঁচ লাখ টাকা অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে।
কক্সবাজারের লিংকরোড থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মহাসড়কের দুইপাশে দেখা যায় আলিশান বহু বাসাবাড়ি। একই অবস্থা কক্সবাজারের কলাতলী, ইনানী, সোনারপাড়া, টেকনাফেও।
অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, কোটি টাকা খরচ করে এক একটি আলিশান বাসাবাড়ি তৈরি হলেও বহু মালিকের টিন নম্বরটিও নেই। বছরে আড়াই লাখ টাকা উপার্জন করলে সরকারকে যে তিন-চার হাজার টাকার কর দিতে হয়-সেকথাটিও তাদের জানা নেই। কারণ তাঁরা আসল ব্যবসায়ী না। তারা হলেন, ইয়াবা আর মানব পাচারকারী। তারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, মানব পাচার অপরাধের বিচারে সাত বিভাগে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হচ্ছে। কিন্তু  কবে নাগাদ সেটি হবে, আর কবেই বা বিচার শুরু হবে, সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জুমান খান কামাল বলেন, মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টালারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১২ সালে প্রণয়নকৃত মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইনে মানব পাচারের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড ও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মানব পাচারকারীরা আর্ন্তজাতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাই আধুনিক ধারণায় মানব পাচার প্রতিরোধ জাতীয় পরিকল্পনা ২০১৫-২০১৭ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা শিগগিরই প্রকাশিত হবে।
কিন্তু সেই খসড়া বা জাতীয় পরিকল্পনায় মানব পাচারকারীদের ‘সম্পদ বাজেয়াপ্ত’ বা ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা’ জারীর ঘোষণা আছে তো ? নইলে মানব পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।
# আব্দুল কুদ্দুস রানা : প্রথম আলোর স্টাফ রিপোর্টার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক-কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়ন। 11272219_752664058184526_58932315_n

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.