টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

আওয়ামী লীগকেই ফাঁদে ফেলুক বিএনপি

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৩
  • ৪২৫ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াশেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াবিএনপির একজন উচ্চপর্যায়ের নেতার কাছে যখন জানতে চাইলাম, একটা গুজব শুনছি যে সরকারি দলই চায় যে বিএনপি সংসদ নির্বাচন বয়কট করুক। তখন তিনি আমাকে অবাক করে ঝটপট উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করি এ রকমের পরিকল্পনা তাদের আছে। বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসে, সে জন্য তারা ফাঁদ পেতেছে।’ এতে সত্যতা কতটা আছে জানি না, তবে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্ণিত ‘ফাইনাল খেলা’ বাংলাদেশ রাজনীতিতে এমন কী দিতে পারে, যা বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি।
প্রায় পাঁচ বছরে বিরোধী দল ও সরকারি দল এমন কিছুই করেনি, যা রাজনীতিতে পরিবর্তনের নতুন কোনো স্পষ্ট মাত্রা নির্দেশ করতে পারে। বিরোধী ও সরকারি দলের প্রতি পারস্পরিক অসহনশীলতা ও অসহিষ্ণু একটি কথা বলা চলে যে বিএনপি কতগুলো ব্যর্থ ও কোলাহলপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পরে একটা মোরাটরিয়াম বা বিরতি নিয়েছে। চীন তা লক্ষ্য করেছে। চীনা দূতাবাসের একটি বিবৃতিতে দেখলাম, চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন বিএনপির সাম্প্রতিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের প্রশংসা করেছেন। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, আগামী কর্মসূচিগুলোও বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবে।

প্রসঙ্গত, ৯ অক্টোবরে চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে দুই মহাসচিবের বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহ ব্যক্ত করা হয়েছে। আজই বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোরের একটা জবর কৌতূহলোদ্দীপক খবর দেখে বাংলাদেশর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক চীনা সম্পৃক্ততার অভিষেকের কথা মনে পড়ল। কারণ ওই সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে যে এক-এগারোর দুই কান্ডারি যাদের তদারকিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে, তারা আমেরিকায় ঈদুল আজহার নামাজ পড়েছেন। সেই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিতও সেখানেই আছেন। সজীব ওয়াজেদ জয়ও আমেরিকা থেকেই দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে বা সরকার গঠনে বা তা টেকানোর প্রক্রিয়ায় অতীতের মতোই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের একটা ভূমিকা থাকবেই। তাই আমেরিকা নামটি অপরিচিত নয়। কিন্তু এতকালের অপরিচিত এবং ২০৩০ সাল কেন্দ্রিক নয়া এশীয় ব্যবস্থায় আমেরিকার অবিসংবাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের দিকে নজর যে দিতেই হচ্ছে। ভবিষ্যতের কোনো একদিনে, সেটা মনে হয় না, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’, আমাদের জাতীয় নেতা কিংবা কুশীলবরা বেইজিং কি কুনমিং থেকেও এভাবে হয়তো ঈদের শুভেচ্ছা পাঠাতে পারেন। গত মাসে কম্বোডিয়ায় দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট ডাকাতির অভিযোগ করে বিরোধী দল। চীন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দলকে বৈধতাদানের এক পরস্পরবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তবে আপাতত ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের এই নির্দিষ্ট মন্তব্য তাত্পর্যপূর্ণ যে, ‘২৫ অক্টোবরের পরে বিএনপি বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে যাবে বলেই আমি মনে করি।’ ২০-২২ অক্টোবরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি তাঁর চীন সফরকালে বাংলাদেশ পরিস্থিতি উহ্য রাখবেন না বলেই ধারণা করা চলে।

২৫ অক্টোবরকে ঘিরে এবারের উত্তেজনা একেবারেই গতানুগতিক বলা যাবে না। কারণ এই কর্মসূচি দিয়ে যে উত্তেজনার স্রোত বইবে, তা একটি ক্ষমতা হস্তান্তর পর্ব পর্যন্ত গড়াতে পারে। এই স্রোতকে একমুখী করার প্রচেষ্টা যদিও আগের মতোই বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ বিএনপি জামায়াত ও জাপাকে নিয়ে একটি অব্যাহত একমুখী আন্দোলনের পথে বড় বাধা হতে পারে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর্বগুলো। ধারণা করা চলে কাকতালভাবে হোক বা না হোক, কাদের মোল্লার সম্ভাব্য ফাঁসি কার্যকর করার মুহূর্ত আসবে এমন সময়ে, যখন বিএনপি ও তার মিত্ররা সরকার পতন ও নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেত সচেষ্ট হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারি দলের এই কৌশল কিংবা ভবিতব্য বুমেরাং হতে পারে। হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে এই রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিএনপি উপযুক্ত রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে পারে। তারা সত্যিই একটি অহিংস আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। জাতি হিসেবে আমরা কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠনের কৌশলই রপ্ত করতে চাইব আর অবাধ ও সুষ্ঠু আন্দোলনের কলাকৌশলগুলো শিখবই না, সেটা নিশ্চয় যুক্তি হতে পারে না।

সাদেক হোসেন খোকার দা-কুড়াল আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘যার যা আছে তা নিয়ে প্রস্তুত হওয়া’র আহ্বানকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এর অর্থ দাঁড়ায় আমরা পরাধীন বাংলাদেশের সরকারকে যেভাবে খেদাতে চেয়েছি, সেভাবে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারকেও খেদাতে চাইছি এবং সেভাবেই খেদানোটা অভ্যাস করে ফেলেছি। লগি-বৈঠা যা দিয়েছে, দা-কুড়ালও তা-ই তো দেওয়ার কথা। এটা তো কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, দুইয়ে দুইয়ে চারের হিসাব।

বাংলাদেশ রাজনীতির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে দিনক্ষণ ঘোষণা দিয়ে বড় অঘটন ঘটে না। বিশেষ করে দুই বড় দল সাম্প্রতিক ইতিহাসে ট্রাম্প কার্ড বা আলটিমেটাম দিয়ে সরকার ফেলতে পারেনি। ২৫ অক্টোবরেও সরকার পড়বে না। কিন্তু এই টিকে থাকাই সরকারি দলের বড় সন্তুষ্টির কারণ হবে না। অতীতের প্রতিটি বিরোধীদলীয় কর্মসূচি নস্যাত্ করতে পারার মধ্যেই সরকারি দল সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছে। কারণ মহাসমাবেশ কি অবস্থান ধর্মঘট প্রতিহত করার অব্যবহিত পরবর্তী শাসনকার্য বা সরকারি কার্যক্রম চালাতে বিরোধী দলের অংশ গ্রহণের কোনো প্রশ্নই ছিল না। ২৫ অক্টোবর থেকে তেমনটি আর থাকছে না। হিসাব-নিকাশ পাল্টাতে হবে। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে হবে। সুতরাং ক্ষমতাসীনরা বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়, এটা ঠিক কি বেঠিক, তা নিশ্চয় গবেষণার বিষয়বস্তু নয়। ক্ষমতাসীনদের জারিজুরি এখন যা দেখা যাচ্ছে, তার বৈধতা মূলত এসেছে বিএনপি থেকেই। কারণ ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল বলেই আজকে আওয়ামী লীগের গলায় এত জোর এসেছে এবং তা শুনতে বেসুরো লাগেনি। অথচ আওয়ামী লীগ ফখরুদ্দীন-মইন উকে গালি দিতে দিতে কখনো তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বসে কিন্তু বিএনপির প্রতি তারা তা ভুলেও করে না। অথচ এটাই সত্য যে অসাংবিধানিক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন আওয়ামী লীগকে যা দিয়েছে, তা এবারের সংবিধানের অধীনের একতরফা নির্বাচন আওয়ামী লীগকে তা দেবে না; বরং ফতুর করে দেবে।

২৫ অক্টোবরে বিএনপি তিনটি স্থানে সভা করার অনুমতি চেয়েছে। এই সভা করার সিদ্ধান্ত পুলিশ নয়, এবারে সিইসিও একটি হস্তক্ষেপ করতে পারেন। কারণ এখন আর কোনো কিছুই নির্বাচনের পরিবেশ উন্নত বা বিঘ্নিত করা ব্যতিরেকে ঘটতে পারে না। স্বয়ং স্পিকার বলেছেন, ২৭ অক্টোবরেও ভোট গ্রহণ হতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী এ কথা সঠিক। আর সিইসি বলবেন, এই সমাবেশ করা না-করায় তাদের কিছু আসে-যায় না, তা তাঁরা বলবেন, কিন্তু রোবোটিক যান্ত্রিকতায় মানা কঠিন।

রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, পদাতিক বাহিনী গোলন্দাজ হয়ে উঠতে পারে। আর সাদেক হোসেন খোকা তো সেই গোলন্দাজ বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের ধরন কী হবে, তা নির্দিষ্ট করেই বলে দিয়েছেন। আইন প্রতিমন্ত্রী যথারীতি আইন দেখিয়েছেন। পুলিশ কেবল খোকার বাড়িতে নন, সারা দেশে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে একটা পাইকারি গ্রেপ্তার এবং দমনপীড়নের আয়োজন চলছে বলে মনে হয়।

ঈদের ছুটিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় ছোট শহরে এসেছি। এখানকার বিএনপির স্থানীয় এক ভদ্রোচিত নেতা জানালেন, তাঁকে এক বন্ধুবত্সল থানা পুলিশ কর্মকর্তা পরামর্শ দিয়েছেন, তিনি যেন ঈদের পরেই সটকে পড়েন। নইলে তাঁর কিছু করার থাববে না। ওই নেতা বললেন, একই প্যাটার্ন। আমরা ক্ষমতায় থাকতেও পুলিশ আওয়ামী লীগকে তা-ই বলেছে।

এখন থেকে বিরোধী দলের অব্যাহত আন্দোলন আর ক্ষমতাসীনদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটা প্রলম্বিত সামাজিক অস্থিতিশীলতা দানা বাঁধতে পারে। অস্থিতিশীলতা তীব্র ও জোরালো হলে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরিবেশে তার একটা সহিংস প্রভাব পড়বেই।

বিএনপি এখন কী করবে। একটা সমঝোতার জন্য উভয় পক্ষ চেষ্টা চালাবে। হয়তো শেষ মুহূর্তে একটা সমঝোতা হবে। কিন্তু তা না হলে কী হবে, সে বিষয়ে হয়তো একাধিক বিকল্প থাকতে পারে।

তবে আমার মনে হয়, বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে একান্ত যদি নাই নির্বাচনে যায়, তাহলে তার সামনে তা ‘যেকোনো মূল্যে প্রতিহত’ করার বিকল্প একমাত্র বিকল্প কি না?

বিএনপির শেকড় সমাজের গভীরে প্রোথিত। বিএনএফের শেকড় হয়তো ধুরন্ধর গোয়েন্দাদের পকেটে। তাই বিএনপি তাহলে সরকারি দলের পাতা ফাঁদেই পা দিক! তারা শান্তিপূর্ণ বিরোধিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচন বয়কট করার কৌশল নিয়েও চিন্তা করুক। ধস্তাধস্তি করে বিনা অনুমতিতে ২৫ অক্টোবরে সভা না করুক। লোকে হয়তো তাকে উপহাস করবে। বলবে বিরোধী দলের সন্যাস ব্রত বেমানান। তদুপরি আমার মনে হয়, বিএনপির উচিত সরকারি দলকেই ফাঁদে ফেলা। তাদের ছাড়াই ভোট করতে দেওয়া। আমার মনে হয়, বিএনপির উচিত হবে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীনদের চাপ প্রয়োগ করা। ভোটাররা যাতে তা বয়কট করে, সে জন্য শান্তিপূর্ণ প্রচারণা চালানো।

কুইনাইন দিয়ে জ্বর সারানো যায় বটে, কিন্তু কুইনাইনের তেতো থেকেই যায়। এই তেতো গণতন্ত্রের জন্য সব সময় তেতো।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT