হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদফিচার

অতিথি কলাম : স্থায়ী সমাধানের চাবি মিয়ানমারের হাতে

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট :2
‘মানবপাচার,মানবাধিকার ও বিশ্ববিবেক’ শিরোনামের আমার লেখাটি দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় গত ১৭/৫/১৫ইং প্রকাশিত হয়েছে, যা ইন্টারনেট ও ফেইসবুকেও প্রচার হয়েছে। তাতে লিখা হয়েছিল, বিশ্বের অতি ক্ষমতাধর প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের প্রভাব অন্য দেশে বিস্তার করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ করে বিভিন্ন নামের অস্ত্রবাহী ফ্লিট বা যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করে বোমা বর্ষণ করে ভিন্ন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করে, নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যা করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মাসাধিক কাল সাগরে ভাসমান খাদ্য ও পানির অভাবে কংকাল হয়ে যাওয়া নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রী মানব সন্তানদের উদ্ধার করার জন্য নৌবাহিনী প্রেরণ করে পরাশক্তিরা মানবতার পক্ষে কাজ করে তা প্রমাণ করছে না কেন সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। প্যালেস্টাইনের মানুষগুলোর অধিকার অস্বীকার করার ফলে সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি হয়েছে। তা অর্ধশতাব্দি চেষ্টা করে প্রবল শক্তি প্রয়োগ করেও দমন করা সম্ভব হয় নাই, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবাদ সম্প্রসারিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সমস্যাও যথাযথভাবে সমাধান করা না হলে তা বিশ্ববিবেকের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন বলে লেখা হয়েছিল। আমার লেখাটি যাদের পড়া উচিৎ সংশ্লিষ্টরা পড়েছেন কিনা না জানলেও সাগরে ভাসা মানুষদের উদ্ধার করার জন্য, সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে তা সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরে ভাল লাগছে।
বাংলাদেশের পোষাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের কারখানায় কাজের সুন্দর,স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নেই, উপযুক্ত বেতন দেওয়া হয় না অভিযোগ করে আমেরিকা,ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো ও উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের তৈরী পোষাক বর্জন করার হুমকী প্রায় সময় দিয়ে থাকে। মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীরা অল্প বেতনে অবৈধভাবে যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকদের ইচ্ছামত ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করার কারণে দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধ মানবপাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। মালয়েশিয়ার তৈরী পামওয়েল বা অন্য সামগ্রী শ্রমিকদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি না করে অল্প বেতনে ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করার কারণে বর্জনের ঘোষণা কি যুক্তরাষ্ট্র বা ইইইউ বা উন্নত দেশগুলোর পক্ষে কোন সময় দেওয়া হয়েছে?
জাতিগত বর্বরতার শিকার হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা নিজের জন্মভুমিতে নাগরিক স্বীকৃতিহীন সীমাহীন নির্যাতন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণের ঝুকি নিয়ে নারী,শিশুসহ পরিবারের সবাই প্রতিবেশী দেশসমূহে নৌপথে পাড়ি জমাচ্ছে। এতে রোহিঙ্গা মুসলিম বিদ্বেষী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মিয়ানমার সরকার উৎসাহ দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের চির কালের জন্য দেশ ত্যাগে সাহায্যকারী দালালচক্র দেখতে পেল যে বাংলাদেশী দরিদ্র বেকার যুবকদের কোন রকমে প্রলুব্ধ করে পাচার করে এনে বন্দী শিবিরে আটক রাখতে পারলে তাদের পরিবারের লোকেরা জমি,বাড়ী বিক্রী করে মুক্তিপণের টাকা দ্রুত দিয়ে দেয়। রোহিঙ্গারা মরে গেলেও মুক্তিপণের টাকা দিতে পারে না। তাই আন্তর্জাতিক দালালচক্র বিনা টাকায় বাংলাদেশীদের নিয়ে যেতে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠে বলে প্রকাশ। এতে মানবপাচার সমস্যা আরো জঠিল ও ভয়াবহ রূপ ধারন করে।
বিশ্বের প্রথম বিবেকবান দেশ হিসেবে তুরস্ক তাদের নৌবাহিনী সাগরে প্রেরণ করে ভাসমান অসহায় মানুষগুলোকে উদ্ধার করার নির্দেশ দিয়ে এবং সাথে সাথে উদ্ধার কাজও শুরু করে বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। ত্রিদেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরী বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দামান সাগরে অভিবাসীদের বহনকারী নৌযান খুঁজে বের করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর টুইটার বার্তায় জানান,ক্ষুধার্ত অসুস্থ মানুষকে সহায়তা করা মানবিক বিষয়। আর কোন প্রাণহানি যেন না হয়। ইন্দোনেশিয়াও অভিবাসীদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হতভাগ্য অভিবাসীদের গণকবর পাওয়া থাইল্যান্ডও বিশ্ববাসীর প্রচন্ড সমালোচনার মূখে সহায়তা দিতে প্রস্তুত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ভাসমান মানবতা উদ্ধারে ও আশ্রয় দানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের বার বার উদ্বেগ প্রকাশ ও আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারও নমনীয় মনোভাবে প্রকাশ করছে। মানবপাচারের এ রোমহর্ষক ঘটনা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলার পর এখন পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে বাংলাদেশ,থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায়। উদ্ধার করা হচ্ছে পাচারের শিকার মানুষদের। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকুলে প্রায় সাত হাজার মানুষ নৌকায় ভাসমান অবস্থায় রয়েছে,যাদের সবাই বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের নাগরিক। সর্বশেষ সংবাদ হল মিয়ানমার নৌবাহিনীও একটি ভাসমান নৌকাসহ প্রায় দুই শত বাংলাদেশীকে উদ্ধার করেছে। তাদের বাংলাদেশে ফেরত আনার প্রস্তুতি চলছে। মিয়ানমারের ব্যাপারে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। কৌশলে মিয়ানমার কর্তৃক নাগরিক হিসেবে অস্বীকৃত রোহিঙ্গাদের নৌকাভর্তি করে বাংলাদেশে পাচারের কুচক্রান্ত করছে কিনা সে ব্যাপারে অধিক সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে।
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সাং সুচি এ বিষয়ে একটি কথাও বলেন নি। শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চির এই নিরবতা সবাইকে বিস্মিত করেছে। তীব্র সমালোচনার মূখে সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমেক্রেসির একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার দেওয়া উচিত। এখন পর্যন্ত সু চি সরাসরি নিজে কিছু বলেন নি। এর আগে ২০১৩ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ( আরকান নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। কার্যত একতরফা ওই দাঙ্গায় শত শত রোহিঙ্গা নিহত হয়। ঘরবাড়ী ছেড়ে পালিয়ে যায় হাজার হাজার। তখনও তিনি কোন কথা বলেন নি। সু চির নীরবতার পিছনে রয়েছে নিষ্ঠুর রাজনীতি। মিয়ানমারের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশই বৌদ্ধ। নির্যাতিত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের প্রতি যৌক্তিক সহানুভুতি দেখাতে গিয়ে জনসমর্থন কমে যাবে সে ঝুকি নিতে চান না তিনি।
সবাই জানে মহামতি গৌতম বৌদ্ধের অমর বাণী হল, অহিংসা পরম ধর্ম। জীব হত্যা মহাপাপ,নরহত্যা মহাপাপ ইত্যাদি। এখন কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা,রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক নেতারা যুগ যুগ ধরে তাদের নাগরিকদের শিক্ষা দিয়ে আসছেন রোহিঙ্গা মুসলমানদের হিংসা করা,নির্যাতন করা,বাড়ীঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে ঘরছাড়া করা,হত্যা করা মহাপূণ্যের কাজ, যা বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কৃত নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা দেখলে বৌদ্ধ বেঁচে থাকলে লজ্জায় আত্মহত্যা করতেন। মিয়ানমারে নির্যাতিত বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশের কিছু ক্যায়াং ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুসলমান নেতারা অবিলম্বে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে,অনেককে গ্রেপ্তার করেছে এবং জ্বালিয়ে দেওয়া ক্যায়াং ঘর ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বসতবাড়ী সরকারী খরচে আগের চেয়ে মজবুত করে পুননির্মাণ করে দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সেই ধরনের কোন সহানুভুতিসূলভ,সহযোগিতামূলক ও সভ্য নজির কি বিশ্ববাসীর কাছে মিয়ানমার সরকার দিতে পারবে?
ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার সময় বলে নাই যে ভারতে শুধু হিন্দুরা বসবাস করবে। পাকিস্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার সময় বলে নাই যে শুধু মুসলমানরাই পাকিস্তানে থাকবে। আবার বার্মাকে স্বাধীনতা দিয়ে যাওয়ার সময় ঘোষণা করে নাই যে স্বাধীন বার্মায় শুধু বৌদ্ধরা থাকবে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা সেই দেশে বসবাস করতে পারবে না। তা হলে কেন শত শত বছর ধরে বসবাস করা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে লাগাতার অত্যাচার,অবিচার,নির্যাতন,নিপিড়নের মাধ্যমে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হবে? জাতিসংঘ,যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর উচিত মিয়ানমারে শত শত বছর পূর্ব থেকে বসবাসকারী সেই দেশে জন্মগ্রহনকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের জন্মভুমি,মাতৃভুমি ত্যাগে বাধ্য না করে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করা।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী। – See more at: http://www.dainikcoxsbazar.net/?p=58447#sthash.0mBUq5SA.dpuf

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.